Monday, March 8, 2010

ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে বাংলাদেশ






বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে নবপ্রতিষ্ঠিত ভিন্ন যে ধারাটি উজ্জ্বল উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, সে ধারাটি হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। বাংলাদেশের একাডেমিক শিল্পধারায় যদিও ক্যালিগ্রাফির কথা রয়েছে। তবু কী কারণে যে এত বছর ধরে তা চরম অবহেলা পেয়ে এসেছে সেটা বোধগম্য নয়। চারুকলা পাস অধিকাংশ শিল্পীর ধর্মবিশ্বাস যদিও ইসলাম, কিন্তু তাদের ভেতর ক্যালিগ্রাফির প্রতি তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। হয়ত ইসলামে প্রাণীচিত্র অঙ্কন নিষিদ্ধ জেনে পুরো শিল্পচর্চাকে তারা ইসলাম বহির্ভূত মনে করেন। অথচ এশিয়ান বিয়েনালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শিল্পকর্ম কিন্তু ক্যালিগ্রাফি নির্ভর এবং সেটা আরবী ক্যালিগ্রাফি নির্ভর। ১৯৮৬ এর ৩য় বিয়েনাল ও ১২শ বিয়েনাল অর্থাৎ ২০০৬ সালের এই এশীয় দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীতে গ্রান্ড প্রাইজ পেয়েছে ক্যালিগ্রাফি নির্ভর শিল্পকর্ম। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বিয়েনালে বহুসংখ্যক ক্যালিগ্রাফি নির্ভর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হওয়ার পাশাপাশি অনারেবল মেনশন পুরস্কারও পেয়েছে। ক্যালিগ্রাফি যেহেতু হরফ নির্ভর কলা, সুতরাং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার হরফে ক্যালিগ্রাফি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে শুধুমাত্র আরবী ক্যালিগ্রাফি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। এর প্রধান কারন কারণ আরবী লিপির ছন্দময় গতিপ্রকৃতি নিখুঁত শৈলী ও উপস্থাপন চাতুর্য। সম্প্রতি দুবাইয়ে পরপর দুটি শৈলীভিত্তিক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী হয়েছে। লন্ডনে, সিউলেও ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর সংবাদ আমরা পেয়েছি। বাংলাদেশেও ৯ম ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মে ২০০৬। বিশ্বব্যাপী ক্যালিগ্রাফির এই যে প্রচার, প্রসার ও খ্যাতি, সেটা মূলত এর শৈলী ভিত্তিক উপস্থাপনার জন্য।বর্তমাে বাংলাদেশে আরবী ক্যালিগ্রাফির একটি চলমান জোয়ার আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এ বিষয়ে দর্শক, শিল্পী, সমালোচক, মিডিয়া, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন সবার মাঝে ব্যাপক কৌত’হল ও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে গত এক দশকে ক্যালিগ্রাফি শিল্পকে পরিণত শিল্পযাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করতে দেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের আগ্রহ ও প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পে শৈলীর বিপরীতে পেইন্টিং বিষয়টি প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। স্বভাবত এ শিল্পের সাথে জড়িত অধিকাংশ শিল্পী একাডেমিক শিল্পচর্চায় রত কিংবা সৌখিনভাবে প্রচলিত শিল্প সম্পর্কে অবগত, কিন্তু শৈলীগত দিক থেকে পেছনে থাকার মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে এ বিষয়ে একাডেমিক শিক্ষার কোন সুযোগ না থাকা। তারপরেও ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে যারা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, সংখ্যায় তারা হাতে গোনা হলেও দিন দিন এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের টেট্রডিশনাল আরবী ক্যালিগ্রাফি কোন অবস্থানে রয়েছে সে সম্পর্কে যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশে ক্যালিগ্রাফির বহু সংখ্যক প্রদর্শনী হলেও এখনো আন্তর্জাতিক কোন প্রদর্শনী হয়নি। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজনের পূর্বে অন্তত শৈলীভিত্তিক কাজে সেই মান থাকাটা সম্মানের পশ্ন হয়ে দেখা দেয়। এ পর্যন্ত দেশে যত গুলো ক্যালিগ্রাফির একক ও দলগত প্রদর্শনী হয়েছে সে সব প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণকারী শিল্পীদের শৈলীভিত্তিক কাজ বিবেচনা করলে বিশেষ করে যারা শৈলীকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এমন কয়েকজন শিল্পী হচ্ছেন, শহীদুল্লাহ এফ. বারী, আরিফুর রহমান, বশীর মেসবাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নবীনদের মধ্যে আবু দরদা নুরুল্লাহ, নিসার জামিল ও মোস্তফা আল মারুফের কাজে শৈীৈর বিষয়টি চোখে পড়ার মত। অন্যান্য আরো কয়েকজন রয়েছেন যারা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, শৈলী বা ট্রেডিশনাল ধারার বিষয়টি একটু খোলাশা হওয়া প্রয়োজন। আরবী ক্যালিগ্রাফির প্রধান কয়েকটি লিপি হচ্ছে, কুফি, সুলস, নাশখ, দিওয়ানী, ফারেসী প্রভৃতি ও ফারসী ধারার দুটি প্রধান লিপি নাস্তালিক ও শিকাস্তে। এসব লিপির সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা আমাদের সামনে রয়েছে, এখন এসব লিপিতে নতুন করে ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম করার যে প্রয়াস ও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সেটা মূলতঃএর উপস্থাপন কৌশল, সেটা মূলতঃ এর উপস্থাপন কৌমল, কম্পোজিশন ও ভাঙ্গাগড়ার কাজের সাথে নিরীক্ষার প্রয়োগ। সুতরাং নির্দ্টভাবে যদি বলতে হয়, যে কোন শৈলী যেমন ধরা যাক ‘সুলস শৈলী’ এটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অলংকার সমৃদ্ধ লিপিধারা। একে সুলতানুল খুতুত বা লিপিসমূহের বাদশাহ ও উম্মুল খুতুত বা লিপিসমূহের বাদশাহ ও উম্মুল খুতুত বা লিপিসমূহের জননী বলা হয়। এর তাশকিল বা অলংকার অথ্যন্ত দৃষ্টি নন্দন ও ছন্দময়। এই লিপিতে বাংলাদেশের শিল্পীদেও সর্বধিক সংখ্যক ক্যালিগ্রাফি রচিত হয়েছে। সুতরাং শিল্পীদের কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে এ লিপিটির আক্ষরিক আলোচনা এসে যায়। সত্য কথা বলতে গেলে, ক্যালিগ্রাফি মূলতঃ ওস্তাদ নির্ভর শিল্প, শুধু দেখে দেখে কিংবা বই দেখে শৈলী ভিত্তিক ক্যালিগ্রাফির শত ভাগ কি অর্ধাংশও আয়ত্ব করা দুস্কর। বাস্তব কথা হচ্ছে একজন ওস্তাদেও কাছে ৗশলীর তালিম নিলে ওয হরফ ছয় যে হরফ ছয় মাসে আয়ত্ব করা যায়, সেটা ওস্তাদ ছাড়া ষোল বছরেও ষাট ভাগ আয়ত্ব হয় না। এর সাথে সংশ্লিষ্ট লিপিশিল্পীরা এবিষয়ে বাস্তব প্রমাণ। প্রতিটি শৈলীর কিছু গোপন টেকনিক ও রহস্য রয়েছে। কলম কাটা, দোয়াতের ব্যবহার, কলম ধরা, কাগজের মাপের সাথে কলমের নীবের মাপ, শৈলীর হরফ, লেখার স্ট্রোক ও তারতীবÑতাহকীব সবই রহস্যময়। এই রহস্য ওস্তাদ ছাত্রদের সামনে হাতে কলম উন্মেচন করেন। ক্যালিগ্রাফির অগ্রদূত ও জনক বলে স্বীকৃত ক্যালিগ্রাফার ইবনেবাওয়াব (মৃ. ১০২২) বলেন যে, তিনি কলম কাটতে আড়ালে চলে যেতেন, যাতে এর রহস্য অন্যদেও কাছে প্রকাশ না পায়। কিখ্যাত ফার্সী ক্যালিগ্রাফার মীর আলী, হেরাত (মৃ. ১৫৫৬) -১ম কিস্তি


-মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে “মুহাম্মদ (স.)” শব্দের নান্দনিক উপস্থাপন


ইসলামী ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস ও ক্রমধারায় পবিত্র কুরআন ও হাদীসের বাণী দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে সব চেয়ে বেশী। আললাহ, মুহাম্মদ ও বিসমিললাহ শব্দ দিয়েও অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করেছেন ক্যালিগ্রাফি শিল্পীগণ। হয়ত এমন একজনও ক্যালিগ্রাফার পাওয়া যাবে না যিনি এসব শব্দ দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করেননি। বিশেষ করে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স.) নামটি দিয়ে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। ইসলামে যেহেতু ছবি অঙ্কন নিষিদ্ধ, তাই পবিত্র কুরআন হাদীসের বাণী ও আললাহ, রাসূল, মুহাম্মদ বিসমিললাহ শব্দ দিয়ে শিল্পীগণ আধ্যাত্মিক শিল্পকর্ম নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। এতে পুণ্যলাভের আকাক্সক্ষা করেছেন। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকেই বিভিন্ন শৈলী নাশখী, সুলস, কুফী, দিওয়ানী, রিকা, রায়হানী, তালিক, মুহাক্কাক প্রভৃতি আরবী শৈলীর সাথে নাস্তালিক, শিকাস্তে ফারসী শৈলী এবং সিন্দী, মুলতানী উর্দূ শৈলীতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ভাষা ইংরেজী, চিনা, জাপানী এমনকি বাংলা লিপিতেও ক্যালিগ্রাফির প্রয়াস চালানো হয়েছে। রাসূল (স.) বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার, গোত্র প্রধানের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন পত্রের মাধ্যমে। কুফী লিপিতে লেখা এসব পত্রের শেষে একটি সিলমোহরেরছাপ দেয়া হয়েছে, যাতে পর্যায়ক্রমে উপর থেকে নিচে আল্লাহ, বাসূল মোহাম্মদ শব্দ রয়েছে। উল্লেখ্য, কুফী লিপিতে লেখা হয়েছে এসব শব্দ। বলা যায়, ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে মুহাম্মদ শব্দের ব্যবহার সেটাই প্রাচীনতম। এরপর কুফা, হিরা, আম্বও, মক্কা মদীনার ক্যালিগ্রাফারগণ কুফী লিপিতে মুহম্মদ শব্দ দিয়ে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করেছেন। গোলায়িত ছয়টি ধারা সুলুস, নাশখী, রাইহান, মুহাক্কাক, তাওকী ও রিকার সাথে কুফী লিপি ও বিভিন্ন ভাষার লিপিতে মুহাম্মদ (স.) নামের ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। ফাতেমী যুগে কায়রোর আল আকশার মসজিদে কুরআনের একটি আয়াতের বৃত্তাকার লেখার মধ্যস্থলে মুহাম্মদ ও আলী কুফী দায়েরাহ লিপিতে লেখা হয়েছে। এছাড়া কুফী মুয়াররাক মাদফুর লিপিতে মুহাম্মদ (স.) ৮ বার লিখা হয়েছে। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন এই আটকোণা তারকা সদৃশ ক্যালিগ্রাফিটি করেছেন বিখ্যাত ইরানী ক্যালিগ্রাফার শায়খ ইব্রাহীম ফাদেল মাশহাদানী। ১৩৮৭ হিজরীতে কুফী মাদফুর লিপিতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ক্যালিগ্রাফিটি করেছেন আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবদুল কাদের। ৫ কোণা তারকার মত করে ৫ বার মুহাম্মদ (স.) শব্দটি লেখা হয়েছে। ১৩৯৪ হিজরীতে ক্যালিগ্রাফার হাসান হাবাস এটি কুফী মুরাববাআ লিপিতে লিখেছেন। চমৎকার একটি চৌকোণা ক্যালিগ্রাফিতে মুহাম্মদ শব্দটি চারবার লেখা হয়েছে। পটভূমিতে লিপি চাতুর্য্যওে প্রয়োগের ফলে সাদা জমীনে অনুরূপ চারবার আলী লেখা ফুটে উঠেছে। এই বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফিটি করেছেন প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার কামিল সালমান জাবুরী। সম্ভবত ১৪২০ হিজরীতে এটা লেখা হয়েছে। এ শতাব্দীর বিখ্যাত তুর্কী ক্যালিগ্রাফার আমিন বারিন পত্রপল্লবিত কুফী লিপিতে গোলাকার আকৃতিতে মুহাম্মদ শব্দটি ৫ বার লিখেছেন। কিন্তু একটি মিম থেকে শব্দ ৫টি ফুলের পাপড়ীর মত ছড়িয়ে পড়েছে। এ রকম সুলুস লিপিতে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে মুহাম্মদ শব্দটি নিয়ে। অপরাপর আরবী শৈলী রাইহান, মুহাক্কাক, তাওকি, রিকা, নাশখী এবং ফারসী লিপি নাস্তালিক, শিকাস্তে লিপিতে আমরা মুহাম্মদ শব্দ দিয়ে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি দেখতে পাই। বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরাও শুধু আরবী নয় বাংলা লিপিতেও মুহাম্মদ শব্দটি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফি করেছেন। রাসূলের (স.) প্রতি ভালবাসা, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রেমের নজরানার প্রকাশ করতে গিয়ে এসব ক্যালিগ্রাফি তারা করেছেন বলে ধারণা করা হয়। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ক্যালিগ্রাফির হরফ




শিল্পকলার প্রাচীন ও প্রধানতম শাখা হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। আমরা জানি হরফ দিয়ে ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ক্যালিগ্রাফি হরফ আর বইয়ের হরফের মধ্যে কি ধরনের মিল-অমিল থাকে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। শিল্পকলা বিশেষ করে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পন্ডিতগণ মনে করেন ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্মে ব্যবহৃত হরফ নিয়ে দ্বিবিধ কথা রয়েছে। ট্রেডিশনাল বা দ্রুপদি শৈলী ভিত্তিক ক্যালিগ্রাফিতে হরফের নিখুঁত, দক্ষ ও শৈল্পিক উপস্থাপনই মুখ্য সেখানে অন্যকিছু গৌণ। কিন্তু পেইন্টিংয়ে ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্মটি নানান মাত্রায় এসে থাকে। সেখানে শিল্পীর দর্শন, পেইন্টিংয়ের নীতিমালা এবং ক্যালিগ্রাফির দ্রুপদি উপস্থাপন একত্রে একটি মোহনীয়, মর্মভেদী আবহ তৈরী করে। বিশেষ করে ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে যেখানে আরবী হরফের ব্যবহার করা হয়, সেখানে কুরআন ও হাদীসের বাণী নির্ভর ক্যালিগ্রাফি হলে দ্রুপদি ক্যালিগ্রাফির নীতিমালাসহ উপস্থাপিত বাণীটির নির্ভুল ও নির্ভেজাল বানানরীতি, প্রয়োগরীতি সবকিছু মেনে চলতে হয়। পাকিস্তানে শিল্পকলার গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। উর্দুতে ক্যালিগ্রাফিকে বলা হয় খতাতি। মূলতঃ টাইপসাজি বা টাইপ্রোগ্রাফি এবং হরফসাজি বা লেটারিং-এর সমন্বয়ে যখন চমৎকার হরফ ভিত্তিক শিল্পকর্ম তৈরী হয় তখন তাকে খতাতি বা ক্যালিগ্রাফি বলে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, ফারসী বা চীনা ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম হয়ত ঐ ভাষার বহু লোক পড়তে পারে না কিন্তু হরফের নান্দনিক উপস্থাপন তাদেরকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে নিজের করে পাবার জন্য তা কিনে নিয়ে বাসা বাড়িতে ঝুলিয়ে রাখে। এর জন্য তাদের হৃদয়ে প্রবল ভালবাসা মমত্ববোধ তৈরী হয়। ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে আরেকটু অগ্রগামিতা রয়েছে। এটি পবিত্র শিল্প হিসেবে দর্শকের কাছে বিবেচিত এবং ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থান, বাসাবাড়ী সবখানেই রাখা যায় এবং এর সাথে পুণ্যের বিষয়টিও জড়িত। ক্যালিগ্রাফিকে খোশ নবীশীও বলা হয় উর্দুতে। কারণ এটি গুরু নির্ভর শিল্প। যেখানে প্রতিদিন অনুশীলন, চর্চা চালিয়ে যেতে হয়। হরফের নিখুঁত আকার ও পরিমাপ হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে কলমের আচঁড়ে তা প্রকাশ করতে হয়। কলম কাটা যেমন শিখতে হয় তেমনি প্রতিটি দ্রুপদি শৈলীর জন্য আলাদা ধরনের কলম তৈরী করতে হয়। কালি তৈরী ও ব্যবহারের নিয়ম-কানুন শিখতে হয়। সর্বোপরি আধ্যাত্মিক শিল্প হিসেবে একে গণ্য করতে হয়। ওস্তাদ ক্যালিগ্রাফারগণ ছাত্রদের সার্টিফিকেট দেয়ার পর একজন ছাত্র ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিজকে প্রকাশ করতে পারেন নতুবা নয়। ক্যালিগ্রাফিতে নতুন শৈলী উদ্ভাবন ও ক্যালিগ্রাফরের দক্ষতা, খ্যাতি ও জনগণের মধ্যে তার উদ্ভাবিত নতুন শৈলীটি জনপ্রিয়তা অর্জনের বিষয়টি উললেখ্য, যদিও শৈলীটি নিখুঁত ও শৈল্পিক হলো কিন্তু জনগণের মধ্যে সেটা স্থায়ী হলো না, তাহলে নতুন শৈলীটির অপমৃত্যু হতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও একটি শৈলী সাময়িক চাপা পড়ে থাকলেও পরে একসময় সেটা দ্বিগুণ জৌলুস নিয়ে ফিরে আসে। আবার এক অঞ্চলের ক্যালিগ্রাফি অন্য অঞ্চলে ততটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে হয়তো পারছে না। তবে সব জায়গায়ই বইয়ের হরফ ও ক্যালিগ্রাফির হরয়ে পার্থক্য রয়েছে। ক্যালিগ্রাফির হরফ নিয়ে পন্ডিতগণ এক কথায় যা বলেন, তা হচ্ছে বইয়ের হরফ হচ্ছে টাইপোগ্রাফি যাতে লেটারিং একই রকম থাকে এবং একটি আড়ষ্ঠ ভাব থাকে কিন্তু একজন শিল্পী যখন হরফকে নিজের মত করে উপস্থাপন করেন এবং তাতে ছন্দ প্রাঞ্জলভাব ও একটি জীবন্ত আবহ ফুটে ওঠে সেখানেই ক্যালিগ্রাফির হরফের সাথে বইয়ের হরফের পার্থক্য বুঝা যায়। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ভারতে সাম্প্রতিক ক্যালিগ্রাফি চর্চা




ভারতের দিললীর একজন বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন উর্দু ক্যালিগ্রাফার হচ্ছেন আবদুল বাসিত হাশমী। ৫৫ বছর ধরে তিনি এই শিল্পময় হস্তলিপি চর্চা করছেন। ৭২ বছর বয়সী এই লিপিশিল্পী তার জীবনের প্রায় পুরোটা সময় লিপিচর্চার কাজে কাটিয়ে দিয়েছেন, দিললী জামে মসজিদের চত্বরের এক কোনে তাকে বসে থাকতে দেখা যায় আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য। হয়ত কদাচিৎ কেউ আগ্রজ করে তার কাছ থেকে বিয়ের কার্ড, পোস্টার কিংবা কোন প্রচারপত্র বা মানপত্র লিখিয়ে নেয়। সন্ধ্যা হলে তিনি সরঞ্জাম গোছাতে গোছাতে স্বাগত কন্ঠে বলে ওঠেন, আগামী দিনটি যেন শূন্যতায় না কাটে। এটা তার নিঃসঙ্গতার চিত্র শুধু একার নয়। উর্দু ক্যালিগ্রাফি যাকে কিতাবাত বা খতাতী বলে দিললীবাসী ভালো জানে। যখন দশক দুই আগে দিললীতে কম্পিউটার এলো, তখন থেকে কিতাবাত পেশায় নিয়োজিতদের রুটি রুজিতে মারাত্মক প্রভাব দেখা দিল। মানুষ তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় লেখা লেখির কাজগুলো কম্পিউটার থেকে লিখে নিতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে লাগলো। কম্পিউটারে উর্দু ফন্টের ক্যালিগ্রাফিক চারিত্র পেশাদার কাতিবদের রোজগারে দারুন সংকট সৃষ্টি করেছে। সুতরাং নতুন প্রজন্ম হাতের লেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে বলে হাশমী মন্তব্য করেন। আমরা জানি ক্যালিগ্রাফি শব্দটি গ্রীক ক্যালোস অর্থাৎ সুন্দর এবং গ্রাফোস অর্থাৎ লেখা এর সমন্বয় হস্তলিপিকলা। প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহৃত লিপি এবং হস্তলিপিকে ফাইন আর্ট বা ধ্রƒপদি কলায় প্রকাশ করার মাধ্যমে এটি জনগণের হৃদয়ে স্থানলাভ করেছে। ভারতে ক্যালিগ্রাফির কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ধারা ও স্টাইল রয়েছে। পূর্ব এশিয়ান, তিব্বতী, ইসলামিক ও পশ্চিমা ধারা। ঐতিহাসিকরা বলছেন, হরপ্পা, মহেনজোদারো আর অশোকান আমলের স্থাপত্যে যে লিপিচিত্র উৎকীর্ণ রয়েছে তাই ভারতের প্রাচীন ক্যালিগ্রাফির নমুনা। আর দিললীতে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির পত্তন ও প্রসার ঘটান মোঘল শাসকরা। সাম্প্রতিক ভারতের ক্যালিগ্রাফি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এ সময়ের খ্যাতিমান ক্যালিগ্রাফার আনিস সিদ্দিকী। তিনি ভারতের প্রাচীন এই শিল্পটি সম্পর্কে বলেন, ক্যালিগ্রাফির মত পবিত্র ও হৃদয়গ্রাহী শিল্পটি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে দিনাতিপাত করছে। কারণ এর পেছনে কোন পৃষ্ঠপোষক নেই। তিনি নিজেও খুব খারাপ সময় অতিক্রম করেছেন বলে মন্তব্য করেন। তবে ক্যালিগ্রাফির উজ্জ্বল সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৮৫৭ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার মির পাঞ্জা কাশ, হিরালাল জয়পুরী, মুহাম্মদ ইউসুফ দিললীভি, যিনি দেশভাগের সময় পাকিস্তান চলে গিয়েছেন, মুন্সী ইয়াকুব সাহারানপুরী হাল আমলের উললে যোগ্য ক্যালিগ্রাফার। সিদ্দিকী বলেন, এখনও রাষ্ট্রপতি ভবনে গেলে মুহাম্মদ ইউসুফ দিললীভির শিল্পকর্ম দেখা যাবে। মুগল আমলের অবসান ও ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে ভারতে উর্দু ক্যালিগ্রাফির দূর্গতি শুরু হয়। দিললীতে এর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশী। ইংরেজরা সরাসরি ইংরেজী ক্যালিগ্রাফির জন্য সরকারীভাবে অর্থ সহায়তা দিতে থাকে এবং উর্দু-আরবী ক্যালিগ্রাফির জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বৃটিশ সরকার ইউরোপ থেকে বহু ইংরেজ ক্যালিগ্রাফা কে নিয়ে আসে এবং তাদের সরকারীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে উর্দু ক্যালিগ্রাফি মৃত্যু মুখে পতিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে উর্দু ক্যালিগ্রাফির পুনর্জাগরণে বেসরকারীভাবে প্রয়াস লক্ষণীয়। সারা ভারতে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর প্রোমশন অফ উর্দু ল্যাঙ্গুয়েজ (এনসিপিইউএল) ১৪টি কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফি প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেছে। এর একটি কেন্দ্র পূর্ব দিললীর সাদারায় বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এছাড়া উর্দু একাডেমী ২ বছরের ক্যালিগ্রাফি কোর্স চালু করেছে। এই কোর্সের ৩০ জন ছাত্র একই সাথে ক্যালিগ্রাফি ও ডিজাইন সফটওয়ার শিখছে। সিদ্দিকীও সারিতা বিহারে একটি ক্যালিগ্রাফি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেছেন। তিনি বলেন, কেউ যেন কম্পিউটারকে দোষ দিতে না পারে। এজন্য কম্পিউটার ও ক্যালিগ্রাফি একত্রে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। সিদ্দিকী ক্যালিগ্রাফির ওপর গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। কম্পিউটারের ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কথা উললেখ করে বলেন, কম্পিউটারে উর্দু ক্যালিগ্রাফির সাধারণ টেক্স ব্যবহার করা সহজ এবং সাধারণ লেখার জন্য এটা খুবই উপযোগী অন্যদিকে খতাতি, যেটা ক্যালিগ্রাফারদের ছাড়া শুধু কম্পিউটার দিয়ে সম্ভব নয়। একজন ক্যালিগ্রাফারই পারেন কম্পিউটার ব্যবহার করে যথাযথ ক্যালিগ্রাফি করতে। সেক্ষেতেও রিড বা খাগের কলম হচ্ছে মূল মাধ্যম। কারণ সাধারণ মানুষ খাগের কলম ব্যবহারে পারদর্শী নয়। সুতরাং তারা কখনও ক্যালিগ্রাফারদের সমতুল্য হতে পারেনা। সাধারণ মানুষ এমনকি চারুকলার বহু শিল্পী ও কিতাবাত ও খতাতী একই বিষয় মনে করেন। কিন্তু আসলে তা নয়। আপনি কোন খতাতী াশল্পকর্ম দেখলেন। ভাষাটা আপনার জানা না থাকলেও দৃষ্টি নন্দন বিষয়ের জন্য সেটাতে আপনি আকৃষ্ট হতে পারেন। যেমন ধরুন একটি কুরআনের বাণীর ক্যালিগ্রাফি বা খতাতী আপনি দেখলেন, আরবী ভাষা কিংবা শিল্পকর্মে উপস্থাপিত লিপিটির মর্মোদ্ধার আপনি তাৎক্ষণিকভাবে করতে পারলেন না। কিন্তু এর প্রয়োগরীতি উপস্থাপন কৌশল ও সূক্ষ্ম শিল্পবোধ আপনার হৃদয়কে আলোড়িত করবে আপনি এত মুগ্ধ হবেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কোন কোন অনুভবে। সিদ্দিকী অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ক্যালিগ্রাফিতে প্রাচীনকাল থেকে সাম্প্রতিক সময়েও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রীড পেন বা খাগের কলম। সারা পৃথিবীতে মানুষ ক্যালিগ্রাফির শিক্ষা গ্রহণ করে খাগের কলমের মাধ্যমে। কারণ খাগের কলমের কোন বিকল্প আজও বের হয়নি। ভারতে খাগের কলমের প্রায় ৩৫ প্রকারের নাম পাওয়া যায়। যেমন দিললীতে এক সারকান্দা, পাঞ্জাবে একে কান্না এবং পশ্চিম বাংলায় একে কাতপথী নামে ডাকা হয়। ভারতে নব উত্থান পর্ব চলছে ক্যালিগ্রাফির। সিদ্দিকী মনে করেন, একে সংরক্ষণ ও চলমান রাখতে বিদ্যালয়ে পাঠ্য করা উচিত এবং এটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি ও সরকারীভাবে এর ক্ষেত্র তৈরী করে নিয়োগের ব্যবস্থা করা উচিত। দেখুন, মানুষ এতে আগ্রহী হয় না এজন্য যে এটা পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। সিদ্দিকী বলেন, দুই দশক ধরে তিনি ক্যালিগ্রাফি চর্চা ও সমাজে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কাজ করছেন, কিন্তু দশ বছর আগেও তিনি এর কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পাননি। এমনকি কোন সুযোগও তিনি পাননি। তিনি উললেখ করেন যে, সম্রাট শাহজাহান, আওরঙ্গজেব এবং বাহাদুর শাহ জাফর দিলেন ভারতের নামকরা ক্যালিগ্রাফার। সম্রাট আকবর ক্যালিগগ্রাফার হিসেবে পরিচিতি না পেলেও শিক্ষাক্ষেত্রে সিলেবাসে ক্যালিগ্রাফিকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ক্যালিগ্রাফাররা সরকারীভাবে এ শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের জোর দাবী জানাচ্ছেন। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

Wednesday, March 3, 2010

দুবাই ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফির ৪র্থ জমজমাট প্রদর্শনী


আরবী ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে আরব শিল্পকলার প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা আরব সভ্যতার প্রাথমিক যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং দীর্ঘ ১৪শ বছরের আলোকোজ্জ্বল পথ পাড়ি দিয়ে আরব সভ্যতার আধুনিক পর্যায়ে এসে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এটা The core of genuine arts অর্থাৎ প্রকৃত শিল্পকলার শাস এবং অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের উৎস য অনুপ্রেরণা স্বরূপ। বিশেষ করে যুখরুফাহ আল আরাবিয়া বা আরবী নকশাকলা, আরব স্থাপত্য ও পবিত্র কুরআনের অলৌকিক এবং অমীয় বাণী পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আরবী ২৮টি হরফ ইসলামী হরফ হিসেবে পরিগণিত হয়। আরবী ক্যালিগ্রাফির প্রতি শুধু প্রশংসা বাণী নয় বরং আরবী হরফের অত্যাশ্চর্য আকৃতি বিশেষ করে যেটা বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রয়োগ ও পরিশোধন করা হয়েছে। আরবী হরফের ক্যালিগ্রাফিতে রয়েছে চমৎকার ঐকতান ও সৃজনশীল শৈল্পিক অবকাঠমোগত প্রকাশের ক্ষমতা, পবিত্র কুরআনের কাতিব বা লিপিকার থেকে যা অনুপ্রাণিত হয়ে সহজেই একজন আরবী ক্যালিগ্রাফারের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। আরবী হরফের স্বাভাবিক নমনীয়তা, সৌন্দর্য প্রকাশের সহজাত বৈশিষ্ট্যকে একজন ক্যলিগ্রাফার সফলভাবে প্রয়োগ করে বহুমুখী সৃজনশীল শিল্পকর্ম সেটা ট্রেডিশনাল কিংবা পেইন্টিং অথবা অন্য কোন মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন। তবে ট্রেডিশনাল বা শৈলীভিত্তিক ক্যালিগ্রাফির যে অন্তর্নিহিত শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেটা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই শুধু খাগের কলমের টানে যে ক্যালিগ্রাফি আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় সেটাতে অলৌকিক, আধ্যাত্মিক ও স্রষ্টার সাথে রসসিক্ত এক মৌন আলাপনই হৃদয়ে জেগে ওঠে। অনুভবে এক অনাবিল প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফি। দুবাই ডিপার্টমেন্ট অব টুরিজম এন্ড কমার্স মার্কেটিং (ডিটিসিএম) ৪র্থ বারের মত দুবাই আন্তর্জাতিক আরবী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। গত ২২ থেকে ২৮ ফেব্র“য়ারি ২০০৭ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জমজমাট এ প্রদর্শনেিত ৯টি দেশে ২১ জন সমকালীন অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী ক্যালিগ্রাফারের বাছাইকৃত অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্ম স্থান পায়। প্রায় সবগুরলা শিল্পকর্মই প্রদর্শনীর প্রথম দু’তিন দিনে বিক্রি হয়ে যায়। সমাপনী অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড আরব আমিরাতের সংস্কৃতি, যুব ও সমাজ উন্নয়ন মন্ত্রী আবদুল রহমান আল ওয়াইস বর্তমান সময়ের খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্যালিগ্রাফার ও ওস্তাদ তুরস্কের হাসান চালাবীকে বিশেষ এ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। মিজান বা স্বরচিহ্ন বিশিষ্ট এই বিশেষ ট্রফিটি গ্রহণকালে আরো উপস্থিত ছিলেন ডিটিসিএম-এর মহাপরিচালক খালিদ এ বিন সুলাইম। ওআইসির গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক বিশেষ সহযোগিতায় এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। দুবাই এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শেখ হামদান বিন মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাখতুমের অর্থায়নে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী ক্যালিগ্রাফারগণ হলেন--আহমদ আমীন শামতাহ (সিরিয়া), জাওয়াদ খোরান (ইরান), হাকেম গান্নাম (ইরাক), হুসাইন আলী আসিরী আল হামিশী (সৌদি আরব), প্রফেসর ড. খশরু সুরাশি (তুরস্ক), দাউদ বাকতাশ (তুরস্ক), ড. রোদান ভায়াহ (ইরাক), আব্বাস আখাউইন (ইরান), ওসমান ওজচাই (তুরস্ক), মোহাম্মদ জাকারিয়া (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), মোহাম্মদ মানদি (মিশর), নাজিয়া সুবাশি (তুরস্ক), ওসসাম শওকত (ইরাক), ইয়াকুব ইবরাহীম সুলাইমান (জর্ডান) ও আরব আমিরাতের ৪ জন মহিলা ক্যালিগ্রাফার যথাক্রমে ফাতিমা সাঈদ (দুবাই), ফাতিমা মোহাম্মদ আব্দুর রহীম (ইউএই), মাজিদাহ সালিম মুহাম্মদ (শারজাহ) ও নারজিস নূরুদ্দিন (আবুধাবী)। ট্রেডিশনাল আরবী ক্যালিগ্রাফির সুলুস, নাশখ, দিওয়ানী, কুফি, নাস্তালিক প্রভৃতি ধারায় সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী কালি দিয়ে এবং ক্যালিগ্রাফির খাগের কলম দিয়ে শিল্পকর্ম করা হয়েছে। প্রদর্শনী উপলক্ষে ৮০ পৃষ্ঠার একটি অসাধারণ ক্যাটালগ প্রকাশ করা হয়। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের পোটেট ছবি, ক্যালিগ্রা”িফর একটি করে শিল্পকর্মের ছবিসহ এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিখ্যাত সমকালীন ক্যালিগ্রাফারদের মন্তব্যসহ আরবী ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস, ক্রমধারা, উন্নয়ন প্রকৃতি নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র ও ক্যালিগ্রাফিসহ একটি মহামূল্যবান প্রবন্ধ রয়েছে। বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফি গবেষক ওস্তাদ মুহাম্মদ আবদুরবাহ উলান প্রবন্ধটি লিখেছেন। বাংলাদেশেও ট্রেডিশনাল আরবি ক্যালিগ্রাফির চর্চা শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে “ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি বাংলাদেশ” নামের সংগঠনটি শৈলীভিত্তিক ক্যালিগ্রাফি শেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলদেশ থেকে এবারই প্রথম তুরস্কে ওআইসি’র গ্রবষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত ৭ম হাশিম মোহাম্মদ আল বাগদাদী শৈলীভিত্তিক আরবী ক্যালিগ্রাফির সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা হয়। ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আহ্বান জানানোর পর ১২ জন নবীন-প্রবীণ ক্যালিগ্রাফি শিল্পী এতে রেজিস্ট্রেশন করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৫ জন প্রতিযোগিতায় শিল্পকর্ম পাঠায়। খাগের বা বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে, নির্দিষ্ট মাপের নীব ও কাগজে নির্দিষ্ট আয়াত ও টেক্সট, নির্দিষ্ট শৈলীতে শিল্পকর্ম করতে হয়। বিশুদ্ধ শৈলী ও নিপুণ দক্ষতার প্রতিযোগিতা এটি। বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন, মোহাম্মদ আবদুর রহীম, সেক্রেটারী ও প্রশিক্ষক ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি বাংলাদেশ, আবুদারদা মোহাম্মদ নূরুললাহ সদস্য ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি, মাসুম বিললাহ, মোরশেদুল আলম ও সিদ্দিকা আফরিন লামিয়া, সদস্য ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি বাংলাদেশ।আরবী ক্যালিগ্রাফির ট্রেডিশনাল বা শৈলীভিত্তিক শিল্পকর্মে ঐতিহ্যবোধ, আধ্যাত্মিকতা ও সর্বোপরি এতে নির্ভজাল শিল্প-সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিকভাবে আজ আরবী ক্যালিগ্রাফি নবতর উদ্দিপনা ও প্রেরণা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। দুবাই প্রদর্শনীর মত বাংলাদেশেও ক্যালিগ্রাফির আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সবাই এগিয়ে আসবেন এই আহ্বান জানাই। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি কনটেস্ট ও আমেরিকায় সাম্প্রতিক ক্যালিগ্রাফি চর্চা


১৯৯২ সালে ৩য় আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতার মর্যাদাসম্পন্ন আসরে আমেরিকার মুসলিম ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমেরিকায় মুসলিম ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা স্বাতন্ত্র পরিচয় সংরক্ষণে এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের শিল্পকর্ম তুলে ধরেন। শুধু আমেরিকাই নয় বিশ্বব্যাপী মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক শৈল্পিক মাধ্যম হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার মুসলিম ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা অনুভব করছেন, মুসলিম সমাজ প্রাত্যহিক জীবন যাত্রায় নানাদিক থেকে পশ্চিমা ও ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রভাবের মুখে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ করাটা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে এই চ্যালেঞ্জ প্রকট হঢে দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলামের আবির্ভাবের শুরু থেকেই ক্যালিগ্রাফিকে শিল্প বা আর্ট অঙ্গনে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফিপ্রদর্শনীর আয়োজন করে তাকে ইস্তাম্বুলভিত্তিক ইসলামিক হিস্ট্রি, আর্ট ও কালচারের গবেষণা কেন্দ্র। প্রতি তিন বছর পরপর আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইসলামিক আর্ট হিসেবে ক্যালিগ্রাফির ক্ল্যাসিক ফর্মের উন্নয়নসাধন করা। এর কারণ হচ্ছে, ট্রেডিশনাল স্পিরিটকে বিদেশী প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে মৌলিক নীতিমালা ও বিশুদ্ধ শৈলীর গুণাগুণকে সংরক্ষণ করা। প্রথম আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা ১৯৮৬ সালে বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার হামিদ আইতাক (হামিদ আল আমিদি) (১৮৯১-১৯৮২) স্মরণে ইস্তাম্বুলে আয়োজন করে রিসার্চ সেন্টার ফর ইসলামিক হিস্ট্রি, আর্ট এন্ড কালচার (আই আর সি আই সি এ)। ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় পতিযোগিতা প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ইয়াকুত আল মুস্তাসিমী (মৃত্যু-১৯২৮) স্মরণে, তৃতীয় প্রতিযোগিতা ১৯৯২ সালে ক্যালিগ্রাফির জনক ইবনে আল বাওয়াব (মৃত্যু-১০২২) স্মরণে, চতুর্থ ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা। (১৯৯৭) শেখ হামদুললাহ (১৪২৯-১৫২০) স্মরণে, পঞ্চম ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা (২০০০) সাইয়েদ ইবরাহীম (১৮৯৭-১৯৯৪) স্মরণে, ৬ষ্ঠ ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা (২০০৩) মীর ইমাদ আল হাসেনী (১৫৫৪-১৬১৫) স্মরণে এবং ২০০৬ সালে এবারের ৭ম ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতাটি বিখ্যাতি ক্যালিগ্রাফার হাশিম মুহাম্মদ আল বাগদাদী (১৯১৭-১৯৭৩) স্মরণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বহুদেশ থেকে ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা অংশগ্রহণ করছেন। বরাবরের মতো আমেরিকার স্বনামধন্য ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরাও এতে অংশগ্রহণ করছেন। এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে শিল্পীরা অংশগ্রহণ করছেন। ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি বাংলাদেশের উদ্যোগে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ৭ম আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করছেন ক্যালিগ্রাফি শিল্পী শহীদুললাহ এফ. বারী, আরিফুর রহমান, বসির মেসবাহ, মোহাম্মদ আবদুর রহীম, আমিনুল ইসলাম, নেসার জামিল, আবু দারদা, মোঃ মোরশেদ, মাসুম বিললাহ, ফজলুল হক মারুফ রায়হান ও সিদ্দিকা আফরিন প্রমুখ। তৃতীয় আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় আমেরিকা থেকে ৪ জন ক্যালিগ্রাফি শিল্পী পুরস্কার অর্জন করেন। পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন, আবদুল লতীফ মাদাকী, মামুন সাককাল, আবদুল রহমান ইউসুফ ও মুহাম্মদ জাকারিকা। প্রতিযোগিতায় মোট পুরস্কার মূল্য ছিল ৪০ হাজার ২শ ডলার। ১৯টি পুরস্কারসহ ৫৭টি মেনশন ও ৪৮টি ইনসেনটিভ পুরস্কার ছিল। ২৬টি দেশের ৯৬ জন প্রতিযোগী এতে অংশগ্রহণ করেন। একটি সুদৃশ্য ক্যাটালগে এই শিল্পকর্মগুলো প্রকাশ করা হয়। আমেরিকার নিউইয়র্কে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভুত আবদুল লতিফ মাদাকা ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট জালি সুলুস ও জালি দিওয়ানীতে মেনশন পুরস্কার লাভ করেন। মাদাকা ভারতের হায়দারাবাদে শৈশবে ক্যালিগ্রাফিতে দীক্ষালাভ করেন। ১৯৯৩ সালে মাদাকীর একক প্রদর্শনী নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়। মামুন সাক্কাল কুফী শৈলীতে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। সূরা আল বাকারার ১৪৪ নং আয়াতকে তিনি পবিত্র কাবার আদলে উপস্থাপন করেন। তিনি সিরিয়ার আলেপ্পোয় ক্যালিগ্রাফার ইবরাহীম রিফাইয়ের কাছে ক্যালিগ্রাফি শিখেন। ১৯৭৮ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ক্যালিগ্রাফির ওপর অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। গ্রাফিক ডিজাইন ও স্থাপত্য ডিজাইনে তিনি স্থানীয়ভাবে খ্যাতি লাভ করেছেন। এছাড়া মসজিদ ও ধর্মীয় ইমারাতসমূহে তিনি প্রচুর ক্যালিগ্রাফি প্যানেল তৈরি করেছেন। ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণকারী ক্যালিগ্রাফার আবদুল রহমানইউসুফ ১৯৯৩ সালে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি টেক্সাসের ডালাস থেকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে এবং ১৯৯৩ সালে দিওয়ানী শৈলীতে মেনশন পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ১৯৮৭ সালের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ জাকারিয়া জালি সুলুস শৈলীতে একটি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে ৩য় প্রতিযোগিতায় তিনি একই শৈলীতে ইনসেনটিভ পুরস্কার লাভ করেন। টিন এজার বয়সে জাকারিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একমাত্র মার্কিন মুসলিম নাগরিক হিসেবে ক্যালিগ্রাফিতে তুর্কী ডিপে¬লামা “ইযাজেত” গ্রহণ করেন। তিনি আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্যালিগ্রাফির ওপর শিক্ষা প্রদান করেন। ক্যালিগ্রাফির ওপর লেখা তার দুটি মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। বই দু’টির নাম হচ্ছে, দ্যা আর্ট এবং অবজাভেশনস অন ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি। আমেরিকার বহু জাতিক সমাজে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও শিল্পাঙ্গনে ক্যালিগ্রাফি একটি উলেলখযোগ্য স্থান দখল করে রয়েছে, মামুন সাক্কাল ২০০৬ সালের এপ্রিলে আমেরিকায় আরবি ক্যালিগ্রাফি ও টাইপোগ্রাফি বিষয়ক একটি কনফারেন্সের আয়োজন করেন। এ কনফারেন্সে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে প্রায় ৩০ জন বিশেষজ্ঞ বক্তব্য রাখেন। এতে একটি ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়। বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসলামী শিল্পকলা সুস্থ, সুন্দর জীবনের পথ দেখায়, ইসলামী কক্যালিগ্রাফিকে অবলম্বন করে আমেরিকার কয়েকজন নিবেদিত প্রাণ মুসলিম শিল্পী নিরলস কাজ করে চলেছেন। সাম্প্রতিক ক্যালিগ্রাফি নিয়ে তাদের এই প্রয়াস ভবিষ্যতে আমেরিকায় ক্যালিগ্রাফিতে উজ্জ্বল পথ রচনা করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

তুরস্কের সাম্প্রতিক ক্যালিগ্রাফি চর্চা




তুরস্কের শিল্পকলার ইতিহাসে ক্যালিগ্রাফি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বের শিল্পকলায়ও এর অবস্থান উলেলখ করার মত। আরবী লিপিকলার ইতিহাসে নান্দনিক, ঐতিহ্যিক ও নিজস্বধারা হিসেবে তুরস্কের ক্যালিগ্রাফি সব সময় শিল্পমানকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। বিশেষ করে তুরস্কের ইসলাম প্রবেশ করার মাধ্যমে আরবী লিপির উৎকর্ষ শুরু হয়। ইসলাম রাজশক্তি হিসেবে ১৫১৭ খৃঃ তুরস্কে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্যালিগ্রাফিতে দ্রুত উন্নয়ন সাধিত হয়। তুর্কী ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এর উন্নয়নে। আরবী ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দিয়েছেন ইসলামী গবেষকরা। সেটা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে “আধ্যাতিক রেখা” অঙ্কনকে আরবী ক্যালিগ্রাফি বলে। ইংরেজিতে একে স্পিরিচুয়াল জিওমেট্রি বলা হয়েছে। তুর্কি ভাষায় যাকে রুহী হান্দেজ বলে। নন্দনতাত্ত্বিক এই সংজ্ঞা কালের পরিক্রমায় সত্য বলে বিবেচিত হয়েছে। হরফের পর হরফ বসিয়ে এবং হরফের নানান রূপের ব্যবহারে একটি ক্যালিগ্রাফি সার্থকভাবে আধ্যাতিক ভাব প্রাকাশ করে। আরবী হরফের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে কোন হরফ শব্দের প্রথমে, মধ্যে এবং শেষে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। শৈল্পিক বিচারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পকর্মে এর প্রয়োগ সর্বোচ্চ সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে থাকে। একই শব্দ বিভিন্নভাবে লেখা যায়। আকৃতিগত ভিন্নতার জন্য একই শব্দে ইচ্ছেমত মনের মাধুরী মিশিয়ে কম্পোজিশন ও সৌন্দর্যগত ভেরিয়েশন আনা যায়। এছাড়া শব্দের মধ্যে শব্দ বিনুনী স্টাইল কিংবা ঝুলন্ত স্টাইলে সাজানো যায়। এতে করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কিংবা ইচ্ছে মত ছন্দ ও ভারসাম্য বজায় রেখে ক্যালিগ্রাফি শিল্প কর্ম তৈরি সম্ভব। একই স্টাইলে একটিশব্দকে বহমাত্রিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপনের অবকাশ থাকায় একজন ক্যালিগ্রাফি শিল্পী তার অন্তর নিহিত আধ্যাত্মিক অনুভব এর প্রয়োগ সময়ে দিতে পারেন। মানুষের মাঝে ক্যালিগ্রাফি অলৌকিক কর্মকান্ড হিসেবে যেমন বিবেচিত, তেমনি বরাবরই এ শিল্প ধর্মীয় আনুকূল্য লাভ করে এসেছে। এর সাথে পূণ্য লাভের বিষয়, মানসিক প্রশান্তি, বিপদাপদ থেকে মুক্তির সহায়ও কেউ কেউ মনে করে থাকেন। কয়েক হিজরী শতাব্দী পর আরবী ক্যালিগ্রাফি ইসলামী ক্যালিগ্রাফিরূপে পরিচিতি লাভ করেছে। এবং ইসলামী ক্যালিগ্রাফিকেই বুঝানো হয়। আরবী ক্যালিগ্রাফির প্রয়োগ সুবিধা, নান্দনিক মান বা এসথেটিক ভেলু এবং আললাহর বাণী কুরআনের বাহন হওয়ায় এটা বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। আমরা গবেষকগণের মাধ্যমে জেনেছি নাবাতীয় হরফ থেকে আরবী হরফের উৎপত্তি কিংবা আম্বর, হিরা অঞ্চলের বিশেষ প্রভাব অথবা ফিনিশিয় হরফের গোত্রভুক্ত আরবী হরফ পবিত্র কুরআনের লিপি হওয়ায় এটি বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। ধীরে ধীরে মক্বী মাদানী লিপি হিসেবে কুফী লিপির গোলায়িত ও ঋজু ধারায় কুরআনের অসংখ্য অনুলিপি তৈরি হয়। এভাবে বড় মাপের নীবের থেকে বিভিন্ন মাপের কলম তৈরি হয়। ফলে নিসফ বা অর্ধেক, সুলুস বা এক তৃতীয়াংশ যাকে কালিমুন নিসফ অর্থাৎ অর্ধেক কলম, হাফিফুন নিসফ বা এক-তৃতীয়াংশ হাফিফুন সুলুস বা দুই তৃতীয়াংশ মাপের কলম দিওয় লেখা হয়। স্টাইলের নামকরণও তেমনি হয়। নির্দিষ্ট মাপের কাগজে লেখা বাধ্যতামূলক করা হয় শৈলীর বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য। উমাইয়া আমলেই এই উন্নয়ন সাধন হয়। এরপর আব্বাসীয় আমলে ক্যালিগ্রাফি মূলত: আর্টিস্টিক ধারায় প্রবাহিত হওয়া শুরু হয়। এ সময় কুরআনের কপিগুলোতে অলংকরণ শুরু হয়। তুর্কী ক্যালিগ্রাফাররা এ কাজে যথেষ্ট অবদান রাখেন। এর ভেতর মুহাক্বাক লিপি যেটি ইরাকী নামেও পরিচিত ছিল। ইবনে মুকলার (মৃ. ৯৪০ খৃ.) আনুপাতিক লেখনীর মাধ্যমে এর উন্নয়ন স্বর্ণশিখরে আরোহণ করে। আধুনিক তুর্কী ক্যালিগ্রাফি শিল্পকলার ট্রেডিশনাল ধারায় একটি অসাধারণ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতিনিয়ত এই ধারা উন্নতি করছে। তুরস্কে এ বিষয়ে বছরের প্রায় সবটা সময় জুড়েই অসংখ্য কোর্সের আয়োজন হয়। ক্যালিগ্রাফির সাথে সংশি¬ষ্ট অলংকরণ বা যুখরুফাহ আরাবিয়া, স্বর্ণমন্ডন বা গিল্ডিং, কাগজের বর্ডার ডিজাইন, কাগজ মারবেলিং, মিনিয়েচার পেইন্টিং এবং তুর্কী সঙ্গীতও এর সাথে জড়িত। তুর্কি ভাষায় আরবী ক্যালিগ্রাফির তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত ক্যালিগ্রাফির এমন একটি চমৎকার গ্রন্থ হচ্ছে “রুহী হান্দেজ” (¯িপ্ররিচুয়াল জিওমেট্রি)। তুর্কি লেখক সেলিম তুর্কোগলু তুরস্কের ক্যালিগ্রাফিতে যেসব শূন্যস্থান রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকার প্রয়াস পেয়েছেন তার এই গ্রন্থটিতে। তার এই গ্রন্থটির নামকরণও সেই উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করে দেয়া। প্রাচীন গবেষকরা যেমন ক্যালিগ্রাফিকে ¯িপরিচুয়াল জিওমেট্রি বলেছেন, সেলিম ও তার গ্রন্থটিতে বিষয়টি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। ক্যালিগ্রাফি পরিপূর্ণ শিল্প, সেটা খারে কলমের অন্তরনিহিত গতি প্রকৃতির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেলিম বিষয়টিকে যথাযথভাবে তার বইতে বর্ণনা করেছেন। তিনি আব্বাসীয় আমলের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ইয়াকুত আল মুস্তাসীমীর (মৃত্যু-১২৯৮ খৃঃ) জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, মুস্তাসীমী নানান কর্মকান্ড ও শিল্পকর্ম তৈরীর পাশাপাশি এক হাজার পবিত্র কুরআনের অনুলিপি তৈরি করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত আশ্চর্যের। কারণ শতখানেক কুরআন অনুলিপি করেছেন এমন ক্যালিগ্রাফার যেখানে খুঁজে পাওয়া দুস্কর, সেখানে একহাজার কপি লেখা আসলেই অলৌকিক ব্যাপার। সেলিম তার গ্রন্থটি ক্যালিগ্রাফির একটি নমুনা দিয়ে শুরু করেছেন বইটিতে ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস, বিভিন্ন শৈলী, লেখার উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও তার ব্যবহার এবং প্রতিটি হরফের তত্ত্বীয় আলোচনাসহ হাতে-কলমে লেখার যথাযথ টেকনিক পুংখানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন। হাতে-কলমে সুলুস ও নেসিহ বা নাসখী লিপির অনুশীলনী বা ড্রিলটি লিখেছেন হাসান রেজা এফেন্দি, তালিক শৈলীর ড্রিলটি লিখেছেন হুলুসাই এফেন্দি এবং রিকা শৈলীটি লিখেছেন মুস্তাফা হালিম এফেন্দি। হাসান রেজা এফেন্দির ড্রিলটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ হিসেবে সেলিম তার গ্রন্থে প্রথমবারের মত প্রকাশ করেন। গ্রন্থটির শেষ অধ্যায়ে ইবনে মুকলাহ থেকে আধুনিক ক্যালিগ্রাফির ওস্তাদ আলি আরসালান পর্যন্ত মাস্টার ক্যালিগ্রাফারদের জীবনী লিপিবদ্ধ করেছেন। সেলিম তার গ্রন্থটিতে ক্যালিগ্রাফারদের মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সুলতান দ্বিতীয় বায়োজীদ সে সময়ের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার শেখ হামদুললাহকে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। এতে সমসাময়িক জ্ঞানী-গুণী গবেষকরা হামদুললাহকে ঈর্ষা করতে শুরু করেন। একথা জানতে পেরে সুলতান সে সময়ের সকল গবেষক, স্কলার, বুদ্ধিজীবীকে তার প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। শেষ হামদুললাহকেও আসতে অনুরোধ করেন। সবাই প্রাসাদে উপস্থিত হলে সুলতান প্রত্যেকের কাছ থেকে তাদের লিখিত গ্রন্থ নিয়ে দরবারের মধ্যখানে ¯তূপ করেন। এরপর হামদুললাহর হাত থেকে তার হস্তলিখিত পবিত্র কুরআনের কপিটি নিয়ে উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই কুরআনখানা কি এই ¯তূপের শীর্ষে স্থাপন করবো নাকি ভেতরে ঢুকিয়ে দেবো? তখন সবাই কুরআনের কপিটি গ্রন্থরাজির ¯তূপের শীর্ষে স্থাপনের পক্ষে মত প্রদান করেরন। তখন সুলতান ঐ গ্রন্থরাজির লেখকদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই মহাগ্রন্থ আল কুরআন যেমন সম্মানিত ও মর্যাদাবান, এর লিপিকারও তেমনি সম্মানিত ও উচ্চাসনের অধিকারী। সুতরাং আমি আশা করবো, আপনাদের কারো কাছ থেকে যেন এর লিপিকারের প্রতি সামান্যতম অসম্মানের কোন কিছু প্রকাশ না পায়। তুরস্কে প্রতি তিন বছর পরপর ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফির আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবছরও বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার হাশিম মহিাম্মদ বাগদাদী স্মরণে ৭ম আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ওআইসি’র গবেষণা কেন্দ্র এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। তুর্কি ক্যালিগ্রাফারদের শিল্পকর্ম সম্পর্কে এ সময়ের তুরস্কের ওস্তাদ ক্যালিগ্রাফার হাসান চালাবী বলেন, দিওয়ানী শৈলীতে যেমন তুর্কী ক্যালিগ্রাফাররা জগদ্বিখ্যাত, তেমনি সুলুস শৈলীতেও তুরস্কের ক্যালিগ্রাফাররা বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষ হয়েছেন। আধুনিক ক্যালিগ্রাফিতে বিশেষ করে ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে তুর্কী ক্যালিগ্রাফাররা অসাধারণ অবদান রেখে চলেছেন। ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে তুর্কী ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের আত্মত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম, নিপুণ দক্ষতা ও কর্মকান্ড ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম