Calligraphy by Shirin Abdussaber from Mohamed Gallah on Vimeo.
Saturday, May 15, 2010
Monday, March 8, 2010
ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে বাংলাদেশ


বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে নবপ্রতিষ্ঠিত ভিন্ন যে ধারাটি উজ্জ্বল উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, সে ধারাটি হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। বাংলাদেশের একাডেমিক শিল্পধারায় যদিও ক্যালিগ্রাফির কথা রয়েছে। তবু কী কারণে যে এত বছর ধরে তা চরম অবহেলা পেয়ে এসেছে সেটা বোধগম্য নয়। চারুকলা পাস অধিকাংশ শিল্পীর ধর্মবিশ্বাস যদিও ইসলাম, কিন্তু তাদের ভেতর ক্যালিগ্রাফির প্রতি তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। হয়ত ইসলামে প্রাণীচিত্র অঙ্কন নিষিদ্ধ জেনে পুরো শিল্পচর্চাকে তারা ইসলাম বহির্ভূত মনে করেন। অথচ এশিয়ান বিয়েনালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শিল্পকর্ম কিন্তু ক্যালিগ্রাফি নির্ভর এবং সেটা আরবী ক্যালিগ্রাফি নির্ভর। ১৯৮৬ এর ৩য় বিয়েনাল ও ১২শ বিয়েনাল অর্থাৎ ২০০৬ সালের এই এশীয় দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীতে গ্রান্ড প্রাইজ পেয়েছে ক্যালিগ্রাফি নির্ভর শিল্পকর্ম। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বিয়েনালে বহুসংখ্যক ক্যালিগ্রাফি নির্ভর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হওয়ার পাশাপাশি অনারেবল মেনশন পুরস্কারও পেয়েছে। ক্যালিগ্রাফি যেহেতু হরফ নির্ভর কলা, সুতরাং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার হরফে ক্যালিগ্রাফি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে শুধুমাত্র আরবী ক্যালিগ্রাফি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। এর প্রধান কারন কারণ আরবী লিপির ছন্দময় গতিপ্রকৃতি নিখুঁত শৈলী ও উপস্থাপন চাতুর্য। সম্প্রতি দুবাইয়ে পরপর দুটি শৈলীভিত্তিক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী হয়েছে। লন্ডনে, সিউলেও ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর সংবাদ আমরা পেয়েছি। বাংলাদেশেও ৯ম ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মে ২০০৬। বিশ্বব্যাপী ক্যালিগ্রাফির এই যে প্রচার, প্রসার ও খ্যাতি, সেটা মূলত এর শৈলী ভিত্তিক উপস্থাপনার জন্য।বর্তমাে বাংলাদেশে আরবী ক্যালিগ্রাফির একটি চলমান জোয়ার আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এ বিষয়ে দর্শক, শিল্পী, সমালোচক, মিডিয়া, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন সবার মাঝে ব্যাপক কৌত’হল ও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে গত এক দশকে ক্যালিগ্রাফি শিল্পকে পরিণত শিল্পযাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করতে দেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের আগ্রহ ও প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পে শৈলীর বিপরীতে পেইন্টিং বিষয়টি প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। স্বভাবত এ শিল্পের সাথে জড়িত অধিকাংশ শিল্পী একাডেমিক শিল্পচর্চায় রত কিংবা সৌখিনভাবে প্রচলিত শিল্প সম্পর্কে অবগত, কিন্তু শৈলীগত দিক থেকে পেছনে থাকার মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে এ বিষয়ে একাডেমিক শিক্ষার কোন সুযোগ না থাকা। তারপরেও ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে যারা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, সংখ্যায় তারা হাতে গোনা হলেও দিন দিন এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের টেট্রডিশনাল আরবী ক্যালিগ্রাফি কোন অবস্থানে রয়েছে সে সম্পর্কে যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশে ক্যালিগ্রাফির বহু সংখ্যক প্রদর্শনী হলেও এখনো আন্তর্জাতিক কোন প্রদর্শনী হয়নি। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজনের পূর্বে অন্তত শৈলীভিত্তিক কাজে সেই মান থাকাটা সম্মানের পশ্ন হয়ে দেখা দেয়। এ পর্যন্ত দেশে যত গুলো ক্যালিগ্রাফির একক ও দলগত প্রদর্শনী হয়েছে সে সব প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণকারী শিল্পীদের শৈলীভিত্তিক কাজ বিবেচনা করলে বিশেষ করে যারা শৈলীকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এমন কয়েকজন শিল্পী হচ্ছেন, শহীদুল্লাহ এফ. বারী, আরিফুর রহমান, বশীর মেসবাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নবীনদের মধ্যে আবু দরদা নুরুল্লাহ, নিসার জামিল ও মোস্তফা আল মারুফের কাজে শৈীৈর বিষয়টি চোখে পড়ার মত। অন্যান্য আরো কয়েকজন রয়েছেন যারা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, শৈলী বা ট্রেডিশনাল ধারার বিষয়টি একটু খোলাশা হওয়া প্রয়োজন। আরবী ক্যালিগ্রাফির প্রধান কয়েকটি লিপি হচ্ছে, কুফি, সুলস, নাশখ, দিওয়ানী, ফারেসী প্রভৃতি ও ফারসী ধারার দুটি প্রধান লিপি নাস্তালিক ও শিকাস্তে। এসব লিপির সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা আমাদের সামনে রয়েছে, এখন এসব লিপিতে নতুন করে ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম করার যে প্রয়াস ও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সেটা মূলতঃএর উপস্থাপন কৌশল, সেটা মূলতঃ এর উপস্থাপন কৌমল, কম্পোজিশন ও ভাঙ্গাগড়ার কাজের সাথে নিরীক্ষার প্রয়োগ। সুতরাং নির্দ্টভাবে যদি বলতে হয়, যে কোন শৈলী যেমন ধরা যাক ‘সুলস শৈলী’ এটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অলংকার সমৃদ্ধ লিপিধারা। একে সুলতানুল খুতুত বা লিপিসমূহের বাদশাহ ও উম্মুল খুতুত বা লিপিসমূহের বাদশাহ ও উম্মুল খুতুত বা লিপিসমূহের জননী বলা হয়। এর তাশকিল বা অলংকার অথ্যন্ত দৃষ্টি নন্দন ও ছন্দময়। এই লিপিতে বাংলাদেশের শিল্পীদেও সর্বধিক সংখ্যক ক্যালিগ্রাফি রচিত হয়েছে। সুতরাং শিল্পীদের কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে এ লিপিটির আক্ষরিক আলোচনা এসে যায়। সত্য কথা বলতে গেলে, ক্যালিগ্রাফি মূলতঃ ওস্তাদ নির্ভর শিল্প, শুধু দেখে দেখে কিংবা বই দেখে শৈলী ভিত্তিক ক্যালিগ্রাফির শত ভাগ কি অর্ধাংশও আয়ত্ব করা দুস্কর। বাস্তব কথা হচ্ছে একজন ওস্তাদেও কাছে ৗশলীর তালিম নিলে ওয হরফ ছয় যে হরফ ছয় মাসে আয়ত্ব করা যায়, সেটা ওস্তাদ ছাড়া ষোল বছরেও ষাট ভাগ আয়ত্ব হয় না। এর সাথে সংশ্লিষ্ট লিপিশিল্পীরা এবিষয়ে বাস্তব প্রমাণ। প্রতিটি শৈলীর কিছু গোপন টেকনিক ও রহস্য রয়েছে। কলম কাটা, দোয়াতের ব্যবহার, কলম ধরা, কাগজের মাপের সাথে কলমের নীবের মাপ, শৈলীর হরফ, লেখার স্ট্রোক ও তারতীবÑতাহকীব সবই রহস্যময়। এই রহস্য ওস্তাদ ছাত্রদের সামনে হাতে কলম উন্মেচন করেন। ক্যালিগ্রাফির অগ্রদূত ও জনক বলে স্বীকৃত ক্যালিগ্রাফার ইবনেবাওয়াব (মৃ. ১০২২) বলেন যে, তিনি কলম কাটতে আড়ালে চলে যেতেন, যাতে এর রহস্য অন্যদেও কাছে প্রকাশ না পায়। কিখ্যাত ফার্সী ক্যালিগ্রাফার মীর আলী, হেরাত (মৃ. ১৫৫৬) -১ম কিস্তি
-মোহাম্মদ আবদুর রহীম
ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে “মুহাম্মদ (স.)” শব্দের নান্দনিক উপস্থাপন

ইসলামী ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস ও ক্রমধারায় পবিত্র কুরআন ও হাদীসের বাণী দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে সব চেয়ে বেশী। আললাহ, মুহাম্মদ ও বিসমিললাহ শব্দ দিয়েও অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করেছেন ক্যালিগ্রাফি শিল্পীগণ। হয়ত এমন একজনও ক্যালিগ্রাফার পাওয়া যাবে না যিনি এসব শব্দ দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করেননি। বিশেষ করে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স.) নামটি দিয়ে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। ইসলামে যেহেতু ছবি অঙ্কন নিষিদ্ধ, তাই পবিত্র কুরআন হাদীসের বাণী ও আললাহ, রাসূল, মুহাম্মদ বিসমিললাহ শব্দ দিয়ে শিল্পীগণ আধ্যাত্মিক শিল্পকর্ম নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। এতে পুণ্যলাভের আকাক্সক্ষা করেছেন। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকেই বিভিন্ন শৈলী নাশখী, সুলস, কুফী, দিওয়ানী, রিকা, রায়হানী, তালিক, মুহাক্কাক প্রভৃতি আরবী শৈলীর সাথে নাস্তালিক, শিকাস্তে ফারসী শৈলী এবং সিন্দী, মুলতানী উর্দূ শৈলীতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ভাষা ইংরেজী, চিনা, জাপানী এমনকি বাংলা লিপিতেও ক্যালিগ্রাফির প্রয়াস চালানো হয়েছে। রাসূল (স.) বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার, গোত্র প্রধানের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন পত্রের মাধ্যমে। কুফী লিপিতে লেখা এসব পত্রের শেষে একটি সিলমোহরেরছাপ দেয়া হয়েছে, যাতে পর্যায়ক্রমে উপর থেকে নিচে আল্লাহ, বাসূল মোহাম্মদ শব্দ রয়েছে। উল্লেখ্য, কুফী লিপিতে লেখা হয়েছে এসব শব্দ। বলা যায়, ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে মুহাম্মদ শব্দের ব্যবহার সেটাই প্রাচীনতম। এরপর কুফা, হিরা, আম্বও, মক্কা মদীনার ক্যালিগ্রাফারগণ কুফী লিপিতে মুহম্মদ শব্দ দিয়ে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করেছেন। গোলায়িত ছয়টি ধারা সুলুস, নাশখী, রাইহান, মুহাক্কাক, তাওকী ও রিকার সাথে কুফী লিপি ও বিভিন্ন ভাষার লিপিতে মুহাম্মদ (স.) নামের ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। ফাতেমী যুগে কায়রোর আল আকশার মসজিদে কুরআনের একটি আয়াতের বৃত্তাকার লেখার মধ্যস্থলে মুহাম্মদ ও আলী কুফী দায়েরাহ লিপিতে লেখা হয়েছে। এছাড়া কুফী মুয়াররাক মাদফুর লিপিতে মুহাম্মদ (স.) ৮ বার লিখা হয়েছে। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন এই আটকোণা তারকা সদৃশ ক্যালিগ্রাফিটি করেছেন বিখ্যাত ইরানী ক্যালিগ্রাফার শায়খ ইব্রাহীম ফাদেল মাশহাদানী। ১৩৮৭ হিজরীতে কুফী মাদফুর লিপিতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ক্যালিগ্রাফিটি করেছেন আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবদুল কাদের। ৫ কোণা তারকার মত করে ৫ বার মুহাম্মদ (স.) শব্দটি লেখা হয়েছে। ১৩৯৪ হিজরীতে ক্যালিগ্রাফার হাসান হাবাস এটি কুফী মুরাববাআ লিপিতে লিখেছেন। চমৎকার একটি চৌকোণা ক্যালিগ্রাফিতে মুহাম্মদ শব্দটি চারবার লেখা হয়েছে। পটভূমিতে লিপি চাতুর্য্যওে প্রয়োগের ফলে সাদা জমীনে অনুরূপ চারবার আলী লেখা ফুটে উঠেছে। এই বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফিটি করেছেন প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার কামিল সালমান জাবুরী। সম্ভবত ১৪২০ হিজরীতে এটা লেখা হয়েছে। এ শতাব্দীর বিখ্যাত তুর্কী ক্যালিগ্রাফার আমিন বারিন পত্রপল্লবিত কুফী লিপিতে গোলাকার আকৃতিতে মুহাম্মদ শব্দটি ৫ বার লিখেছেন। কিন্তু একটি মিম থেকে শব্দ ৫টি ফুলের পাপড়ীর মত ছড়িয়ে পড়েছে। এ রকম সুলুস লিপিতে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে মুহাম্মদ শব্দটি নিয়ে। অপরাপর আরবী শৈলী রাইহান, মুহাক্কাক, তাওকি, রিকা, নাশখী এবং ফারসী লিপি নাস্তালিক, শিকাস্তে লিপিতে আমরা মুহাম্মদ শব্দ দিয়ে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি দেখতে পাই। বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরাও শুধু আরবী নয় বাংলা লিপিতেও মুহাম্মদ শব্দটি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফি করেছেন। রাসূলের (স.) প্রতি ভালবাসা, ভক্তি-শ্রদ্ধা ও প্রেমের নজরানার প্রকাশ করতে গিয়ে এসব ক্যালিগ্রাফি তারা করেছেন বলে ধারণা করা হয়। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম
ক্যালিগ্রাফির হরফ


শিল্পকলার প্রাচীন ও প্রধানতম শাখা হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। আমরা জানি হরফ দিয়ে ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ক্যালিগ্রাফি হরফ আর বইয়ের হরফের মধ্যে কি ধরনের মিল-অমিল থাকে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। শিল্পকলা বিশেষ করে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পন্ডিতগণ মনে করেন ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্মে ব্যবহৃত হরফ নিয়ে দ্বিবিধ কথা রয়েছে। ট্রেডিশনাল বা দ্রুপদি শৈলী ভিত্তিক ক্যালিগ্রাফিতে হরফের নিখুঁত, দক্ষ ও শৈল্পিক উপস্থাপনই মুখ্য সেখানে অন্যকিছু গৌণ। কিন্তু পেইন্টিংয়ে ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্মটি নানান মাত্রায় এসে থাকে। সেখানে শিল্পীর দর্শন, পেইন্টিংয়ের নীতিমালা এবং ক্যালিগ্রাফির দ্রুপদি উপস্থাপন একত্রে একটি মোহনীয়, মর্মভেদী আবহ তৈরী করে। বিশেষ করে ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে যেখানে আরবী হরফের ব্যবহার করা হয়, সেখানে কুরআন ও হাদীসের বাণী নির্ভর ক্যালিগ্রাফি হলে দ্রুপদি ক্যালিগ্রাফির নীতিমালাসহ উপস্থাপিত বাণীটির নির্ভুল ও নির্ভেজাল বানানরীতি, প্রয়োগরীতি সবকিছু মেনে চলতে হয়। পাকিস্তানে শিল্পকলার গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি। উর্দুতে ক্যালিগ্রাফিকে বলা হয় খতাতি। মূলতঃ টাইপসাজি বা টাইপ্রোগ্রাফি এবং হরফসাজি বা লেটারিং-এর সমন্বয়ে যখন চমৎকার হরফ ভিত্তিক শিল্পকর্ম তৈরী হয় তখন তাকে খতাতি বা ক্যালিগ্রাফি বলে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, ফারসী বা চীনা ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম হয়ত ঐ ভাষার বহু লোক পড়তে পারে না কিন্তু হরফের নান্দনিক উপস্থাপন তাদেরকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে নিজের করে পাবার জন্য তা কিনে নিয়ে বাসা বাড়িতে ঝুলিয়ে রাখে। এর জন্য তাদের হৃদয়ে প্রবল ভালবাসা মমত্ববোধ তৈরী হয়। ইসলামী ক্যালিগ্রাফিতে আরেকটু অগ্রগামিতা রয়েছে। এটি পবিত্র শিল্প হিসেবে দর্শকের কাছে বিবেচিত এবং ক্যালিগ্রাফির শিল্পকর্ম প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থান, বাসাবাড়ী সবখানেই রাখা যায় এবং এর সাথে পুণ্যের বিষয়টিও জড়িত। ক্যালিগ্রাফিকে খোশ নবীশীও বলা হয় উর্দুতে। কারণ এটি গুরু নির্ভর শিল্প। যেখানে প্রতিদিন অনুশীলন, চর্চা চালিয়ে যেতে হয়। হরফের নিখুঁত আকার ও পরিমাপ হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে কলমের আচঁড়ে তা প্রকাশ করতে হয়। কলম কাটা যেমন শিখতে হয় তেমনি প্রতিটি দ্রুপদি শৈলীর জন্য আলাদা ধরনের কলম তৈরী করতে হয়। কালি তৈরী ও ব্যবহারের নিয়ম-কানুন শিখতে হয়। সর্বোপরি আধ্যাত্মিক শিল্প হিসেবে একে গণ্য করতে হয়। ওস্তাদ ক্যালিগ্রাফারগণ ছাত্রদের সার্টিফিকেট দেয়ার পর একজন ছাত্র ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিজকে প্রকাশ করতে পারেন নতুবা নয়। ক্যালিগ্রাফিতে নতুন শৈলী উদ্ভাবন ও ক্যালিগ্রাফরের দক্ষতা, খ্যাতি ও জনগণের মধ্যে তার উদ্ভাবিত নতুন শৈলীটি জনপ্রিয়তা অর্জনের বিষয়টি উললেখ্য, যদিও শৈলীটি নিখুঁত ও শৈল্পিক হলো কিন্তু জনগণের মধ্যে সেটা স্থায়ী হলো না, তাহলে নতুন শৈলীটির অপমৃত্যু হতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও একটি শৈলী সাময়িক চাপা পড়ে থাকলেও পরে একসময় সেটা দ্বিগুণ জৌলুস নিয়ে ফিরে আসে। আবার এক অঞ্চলের ক্যালিগ্রাফি অন্য অঞ্চলে ততটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে হয়তো পারছে না। তবে সব জায়গায়ই বইয়ের হরফ ও ক্যালিগ্রাফির হরয়ে পার্থক্য রয়েছে। ক্যালিগ্রাফির হরফ নিয়ে পন্ডিতগণ এক কথায় যা বলেন, তা হচ্ছে বইয়ের হরফ হচ্ছে টাইপোগ্রাফি যাতে লেটারিং একই রকম থাকে এবং একটি আড়ষ্ঠ ভাব থাকে কিন্তু একজন শিল্পী যখন হরফকে নিজের মত করে উপস্থাপন করেন এবং তাতে ছন্দ প্রাঞ্জলভাব ও একটি জীবন্ত আবহ ফুটে ওঠে সেখানেই ক্যালিগ্রাফির হরফের সাথে বইয়ের হরফের পার্থক্য বুঝা যায়। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম
ভারতে সাম্প্রতিক ক্যালিগ্রাফি চর্চা


ভারতের দিললীর একজন বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন উর্দু ক্যালিগ্রাফার হচ্ছেন আবদুল বাসিত হাশমী। ৫৫ বছর ধরে তিনি এই শিল্পময় হস্তলিপি চর্চা করছেন। ৭২ বছর বয়সী এই লিপিশিল্পী তার জীবনের প্রায় পুরোটা সময় লিপিচর্চার কাজে কাটিয়ে দিয়েছেন, দিললী জামে মসজিদের চত্বরের এক কোনে তাকে বসে থাকতে দেখা যায় আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য। হয়ত কদাচিৎ কেউ আগ্রজ করে তার কাছ থেকে বিয়ের কার্ড, পোস্টার কিংবা কোন প্রচারপত্র বা মানপত্র লিখিয়ে নেয়। সন্ধ্যা হলে তিনি সরঞ্জাম গোছাতে গোছাতে স্বাগত কন্ঠে বলে ওঠেন, আগামী দিনটি যেন শূন্যতায় না কাটে। এটা তার নিঃসঙ্গতার চিত্র শুধু একার নয়। উর্দু ক্যালিগ্রাফি যাকে কিতাবাত বা খতাতী বলে দিললীবাসী ভালো জানে। যখন দশক দুই আগে দিললীতে কম্পিউটার এলো, তখন থেকে কিতাবাত পেশায় নিয়োজিতদের রুটি রুজিতে মারাত্মক প্রভাব দেখা দিল। মানুষ তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় লেখা লেখির কাজগুলো কম্পিউটার থেকে লিখে নিতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে লাগলো। কম্পিউটারে উর্দু ফন্টের ক্যালিগ্রাফিক চারিত্র পেশাদার কাতিবদের রোজগারে দারুন সংকট সৃষ্টি করেছে। সুতরাং নতুন প্রজন্ম হাতের লেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে বলে হাশমী মন্তব্য করেন। আমরা জানি ক্যালিগ্রাফি শব্দটি গ্রীক ক্যালোস অর্থাৎ সুন্দর এবং গ্রাফোস অর্থাৎ লেখা এর সমন্বয় হস্তলিপিকলা। প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহৃত লিপি এবং হস্তলিপিকে ফাইন আর্ট বা ধ্রƒপদি কলায় প্রকাশ করার মাধ্যমে এটি জনগণের হৃদয়ে স্থানলাভ করেছে। ভারতে ক্যালিগ্রাফির কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ধারা ও স্টাইল রয়েছে। পূর্ব এশিয়ান, তিব্বতী, ইসলামিক ও পশ্চিমা ধারা। ঐতিহাসিকরা বলছেন, হরপ্পা, মহেনজোদারো আর অশোকান আমলের স্থাপত্যে যে লিপিচিত্র উৎকীর্ণ রয়েছে তাই ভারতের প্রাচীন ক্যালিগ্রাফির নমুনা। আর দিললীতে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির পত্তন ও প্রসার ঘটান মোঘল শাসকরা। সাম্প্রতিক ভারতের ক্যালিগ্রাফি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এ সময়ের খ্যাতিমান ক্যালিগ্রাফার আনিস সিদ্দিকী। তিনি ভারতের প্রাচীন এই শিল্পটি সম্পর্কে বলেন, ক্যালিগ্রাফির মত পবিত্র ও হৃদয়গ্রাহী শিল্পটি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে দিনাতিপাত করছে। কারণ এর পেছনে কোন পৃষ্ঠপোষক নেই। তিনি নিজেও খুব খারাপ সময় অতিক্রম করেছেন বলে মন্তব্য করেন। তবে ক্যালিগ্রাফির উজ্জ্বল সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৮৫৭ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার মির পাঞ্জা কাশ, হিরালাল জয়পুরী, মুহাম্মদ ইউসুফ দিললীভি, যিনি দেশভাগের সময় পাকিস্তান চলে গিয়েছেন, মুন্সী ইয়াকুব সাহারানপুরী হাল আমলের উললে যোগ্য ক্যালিগ্রাফার। সিদ্দিকী বলেন, এখনও রাষ্ট্রপতি ভবনে গেলে মুহাম্মদ ইউসুফ দিললীভির শিল্পকর্ম দেখা যাবে। মুগল আমলের অবসান ও ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে ভারতে উর্দু ক্যালিগ্রাফির দূর্গতি শুরু হয়। দিললীতে এর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশী। ইংরেজরা সরাসরি ইংরেজী ক্যালিগ্রাফির জন্য সরকারীভাবে অর্থ সহায়তা দিতে থাকে এবং উর্দু-আরবী ক্যালিগ্রাফির জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বৃটিশ সরকার ইউরোপ থেকে বহু ইংরেজ ক্যালিগ্রাফা কে নিয়ে আসে এবং তাদের সরকারীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে উর্দু ক্যালিগ্রাফি মৃত্যু মুখে পতিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে উর্দু ক্যালিগ্রাফির পুনর্জাগরণে বেসরকারীভাবে প্রয়াস লক্ষণীয়। সারা ভারতে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর প্রোমশন অফ উর্দু ল্যাঙ্গুয়েজ (এনসিপিইউএল) ১৪টি কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফি প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেছে। এর একটি কেন্দ্র পূর্ব দিললীর সাদারায় বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এছাড়া উর্দু একাডেমী ২ বছরের ক্যালিগ্রাফি কোর্স চালু করেছে। এই কোর্সের ৩০ জন ছাত্র একই সাথে ক্যালিগ্রাফি ও ডিজাইন সফটওয়ার শিখছে। সিদ্দিকীও সারিতা বিহারে একটি ক্যালিগ্রাফি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেছেন। তিনি বলেন, কেউ যেন কম্পিউটারকে দোষ দিতে না পারে। এজন্য কম্পিউটার ও ক্যালিগ্রাফি একত্রে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। সিদ্দিকী ক্যালিগ্রাফির ওপর গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। কম্পিউটারের ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কথা উললেখ করে বলেন, কম্পিউটারে উর্দু ক্যালিগ্রাফির সাধারণ টেক্স ব্যবহার করা সহজ এবং সাধারণ লেখার জন্য এটা খুবই উপযোগী অন্যদিকে খতাতি, যেটা ক্যালিগ্রাফারদের ছাড়া শুধু কম্পিউটার দিয়ে সম্ভব নয়। একজন ক্যালিগ্রাফারই পারেন কম্পিউটার ব্যবহার করে যথাযথ ক্যালিগ্রাফি করতে। সেক্ষেতেও রিড বা খাগের কলম হচ্ছে মূল মাধ্যম। কারণ সাধারণ মানুষ খাগের কলম ব্যবহারে পারদর্শী নয়। সুতরাং তারা কখনও ক্যালিগ্রাফারদের সমতুল্য হতে পারেনা। সাধারণ মানুষ এমনকি চারুকলার বহু শিল্পী ও কিতাবাত ও খতাতী একই বিষয় মনে করেন। কিন্তু আসলে তা নয়। আপনি কোন খতাতী াশল্পকর্ম দেখলেন। ভাষাটা আপনার জানা না থাকলেও দৃষ্টি নন্দন বিষয়ের জন্য সেটাতে আপনি আকৃষ্ট হতে পারেন। যেমন ধরুন একটি কুরআনের বাণীর ক্যালিগ্রাফি বা খতাতী আপনি দেখলেন, আরবী ভাষা কিংবা শিল্পকর্মে উপস্থাপিত লিপিটির মর্মোদ্ধার আপনি তাৎক্ষণিকভাবে করতে পারলেন না। কিন্তু এর প্রয়োগরীতি উপস্থাপন কৌশল ও সূক্ষ্ম শিল্পবোধ আপনার হৃদয়কে আলোড়িত করবে আপনি এত মুগ্ধ হবেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কোন কোন অনুভবে। সিদ্দিকী অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ক্যালিগ্রাফিতে প্রাচীনকাল থেকে সাম্প্রতিক সময়েও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রীড পেন বা খাগের কলম। সারা পৃথিবীতে মানুষ ক্যালিগ্রাফির শিক্ষা গ্রহণ করে খাগের কলমের মাধ্যমে। কারণ খাগের কলমের কোন বিকল্প আজও বের হয়নি। ভারতে খাগের কলমের প্রায় ৩৫ প্রকারের নাম পাওয়া যায়। যেমন দিললীতে এক সারকান্দা, পাঞ্জাবে একে কান্না এবং পশ্চিম বাংলায় একে কাতপথী নামে ডাকা হয়। ভারতে নব উত্থান পর্ব চলছে ক্যালিগ্রাফির। সিদ্দিকী মনে করেন, একে সংরক্ষণ ও চলমান রাখতে বিদ্যালয়ে পাঠ্য করা উচিত এবং এটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি ও সরকারীভাবে এর ক্ষেত্র তৈরী করে নিয়োগের ব্যবস্থা করা উচিত। দেখুন, মানুষ এতে আগ্রহী হয় না এজন্য যে এটা পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। সিদ্দিকী বলেন, দুই দশক ধরে তিনি ক্যালিগ্রাফি চর্চা ও সমাজে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কাজ করছেন, কিন্তু দশ বছর আগেও তিনি এর কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পাননি। এমনকি কোন সুযোগও তিনি পাননি। তিনি উললেখ করেন যে, সম্রাট শাহজাহান, আওরঙ্গজেব এবং বাহাদুর শাহ জাফর দিলেন ভারতের নামকরা ক্যালিগ্রাফার। সম্রাট আকবর ক্যালিগগ্রাফার হিসেবে পরিচিতি না পেলেও শিক্ষাক্ষেত্রে সিলেবাসে ক্যালিগ্রাফিকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ক্যালিগ্রাফাররা সরকারীভাবে এ শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের জোর দাবী জানাচ্ছেন। -মোহাম্মদ আবদুর রহীম
Subscribe to:
Posts (Atom)
