Monday, August 3, 2015

Bangla Calligraphy : Feelings and Style বাংলা ক্যালিগ্রাফি : অনুভব ও শৈলী


 



-মোহাম্মদ আবদুর রহীম
মানুষ জীবনযাপনে বাহ্যিক প্রয়োজন পূরণের পরও মানসিক আনন্দলাভ বা আত্মপিয়াস মেটাতে কিছু দেখতে, শুনতে কিংবা ছুয়ে দেখতে চায়। তার সংস্কৃতির মধ্যে নিজকে প্রকাশ করতে কিংবা সৃজনশীল কিছু করে আনন্দ পেতে চায় এবং অন্যকে আনন্দ দিতে তার ইচ্ছে জাগে। সুতরাং বলা যায়, কোন জাতির সংস্কৃতির মধ্যে যে সৃজনশীল ও প্রতিভার পরিচয় আমরা দেখতে পাই, সেটাই শিল্পকলা।শিল্পকলার অতি প্রাচীন একটি শাখা হচ্ছে ক্যালিগ্রাফি।ক্যালিগ্রাফি শব্দটা ইংরেজি। এটা গ্রীক শব্দ ক্যালিগ্রাফিয়া থেকে এসেছে। গ্রীক শব্দ ক্যালোস এবং গ্রাফেইনের মিলিত রূপ ক্যালিগ্রাফিয়া। ক্যালোস=সুন্দর, আর গ্রাফেইন=লেখা।
সুতরাং  ক্যালিগ্রাফির পরিচয় এভাবে দেয়া যেতে পারে-  হরফ বা টেকসট ব্যবহার করে চমৎকার লেখন শিল্পকে ক্যালিগ্রাফি বলে। বর্তমানে, এই আর্ট ফর্মকে বিভিন্ন দেশ, ভাষা এবং ধর্মের লোকেরা আনন্দচিত্তে গ্রহণ এবং চর্চা করে চলেছেন। পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষার হরফে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। আরবি, ইংরেজি, চীনা, জাপানী প্রভৃতি ভাষার হরফের ক্যালিগ্রাফি মানুষকে মোহিত ও আনন্দিত করে।
ক্যালিগ্রাফির এখন দু’টো রূপ প্রচলিত। এক. ট্রেডিশনাল বা ঐতিহ্যবাহী ধারা এবং দুই. পেইন্টিং বা চিত্রকলা।
ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতে সাধারণত হরফকে দৃষ্টিনন্দন করে লেখার বিষয়টি মূখ্য। এটা দু’ধরণের হতে পারে। এক. স্ক্রীপ্ট ক্যালিগ্রাফি এবং দুই. ভিজ্যুয়াল ইমেজ বা দৃশ্যমান ছবির মত ক্যালিগ্রাফি।
 
 
স্ক্রীপ্ট ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে, বইপত্র, নথি, ফরমান, মানপত্র ইত্যাদি কাগজের ওপর  হরফ দিয়ে যে ক্যালিগ্রাফি করা হয়, সেটাই স্ক্রিপ্ট ক্যালিগ্রাফি।আর ভিজ্যুয়াল ইমেজ ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে, শুধু হরফ বা বাক্য বা বাণী দিয়ে বিশেষ কম্পোজিশন বা সাজানো অথবা বিন্যাসের মাধ্যমে একটি ছবির মত তৈরি করা, সেটা প্রচলিত কোন কিছুর সাদৃশ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।সেখানে শুধুমাত্র কালি ও ক্যালিগ্রাফি কলম ব্যবহার করা হয়। কাগজ বা কাপড় বা ক্যানভাস লেখার উপযোগি করে তোলা হয়। যাকে বলে মারবেলিং। ক্রীপ্ট ক্যালিগ্রাফিতে প্রস্থে কম বিস্তারের এবং ইমেজ ক্যালিগ্রাফিতে চাহিদা অনুযায়ী ছোট-বড় মাপের ক্যালিগ্রাফি কলম ব্যবহার হয়।
ক্যালিগ্রাফি কলম দিয়ে লেখার সময় এর কৌণিক দিকটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে লেখা ডান থেকে বাম যায়, যেমন আরবি, সেটার কলমের কৌণিক দিক ডান দিকে এবং হরফের মোটা চিকণও তেমনি হবে। অন্যদিকে যে লিপি বাম থেকে ডানে যায়, যেমন বাংলা, তার কৌণিক দিক বামে হবে এবং হরফের মোটা-চিকণও সেভাবে হবে।
বাংলা হরফের আধুনিকায়ন হলেও প্রাচীন পুথির লিপি যাচাই করে দেখা গেছে এর স্বভাব বরাবর বর্গাকার এবং সমান্তরাল। পুথি লেখায় মাথাকাটা কলম অপেক্ষা গোলায়িত মাথার কলম ব্যবহার হয়েছে এবং লিপিকরের দক্ষতা ও সৌন্দর্যবোধের ভিন্নতায় টানা লেখায়ও ক্যালিগ্রাফির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
লিপির প্রয়োজন কেন?
একটা চিরন্তন সত্য হচ্ছে, মানুষের জীবনটা আয়ুর পরিধিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু তার কীর্তি সময়কে অতিক্রম করে অমরত্ব লাভে সক্ষম। আর এ জন্যই সচেতন মানুষ মাত্রই স্বীয় অমর কীর্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকেন। আমরা অতীত এবং বর্তমান সময়ের পরতে পরতে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই, রাজা রাজন্যসহ সমাজপতি সচেতন শিক্ষিত শ্রেণী তাদের কীর্তিকথা বিজয়গাথা, রাজ্যশাসনের নীতিমালা, উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
কালের অতল গহ্বরে অনেক কীর্তি হারিয়ে যায় আবার কোন উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় অতীত রহস্য।
ভবিষ্যতের জন্য কীর্তির তথ্য জমা রাখার সহজ পন্থা হিসেবে লিপির অবলম্বন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
এভাবে লিপির মাধ্যমে অতীত অভিজ্ঞতা চলে আসে বর্তমানের হাতে।
হরফতত্ত্ব(Paleography)
প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার এবং সেসব লিপির আগাপাশতলা বের করার জন্য এক ধরণের জ্ঞান চর্চা করা হয়, এটা হরফতত্ত্ব নামে পরিচিত। প্রত্নতত্ত্বে যে মটিফ(Motif) সংরক্ষণ করা হয়, তাতে টেরাকোটা 'তবক' বা চাকতি লিপি(terracotta tablet script), ধাতব ফলকলিপি(metal plates inscriptions), বা শিলা ফলকলিপি(stone inscriptions) প্রধান। এছাড়া আরো নানান রকম উপাদান আছে, যা হরফতত্ত্বের অন্তর্ভূক্ত।
এ এক বিচিত্র এবং অত্যন্ত কষ্টসাধ্য জ্ঞান চর্চা। এমনও ঘটনা আছে একটি শিলালিপির পাঠোদ্ধার(decipher) করতে বছরের পর বছর গড়িয়ে যায়। যদিও একটা পাঠ পাওয়া গেল, কিন্তু পরে তা ভুল প্রমাণিত হলো। তবু প্রথম পাঠকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়।

লিপি নিয়ে যারা কাজ করেন
লিপি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের কাজের ধরণ ভিন্ন ভিন্ন দেখা যায়। কেউ লিপির প্রাচীন পাঠোদ্ধারে জীবন কাটিয়ে দেন। কেউ নতুন লিপি তৈরির কাজ করেন, যাকে লিপিকার(Calligrapher/Calligraphist) বলা হয়। আবার লিপি নিয়ে শিল্পকলা করেন যিনি, তাকে লিপিশিল্পী(Calligraphy Artist) বলে।
প্রত্নতত্ত্বের সাথে শিলালিপির পাঠোদ্ধার(decipher) বিষয়টি জড়িত। ছাপাখানা, বই হাতে লেখা, প্রচ্ছদ, বই অলঙ্করণ প্রভৃতির সাথে নতুন লিপি বা প্রচলিত লিপির নতুন সংস্করণ করেন লিপিকার।
আর শিল্পকলায় লিপিকে অনুসঙ্গ করে কিংবা লিপি দিয়েই শিল্পকর্ম করেন লিপিশিল্পীরা। আমাদের ঢাকার চারুকলায় প্রাচ্যকলা বিভাগে এ বিষয়ে তালিম দেয়া হয়।
তবে অধিকাংশ ভাষার লিপি দিয়ে এখন আর শিল্পকলার প্রবাহমান ধারা লক্ষ্য করা যায় না। এক্ষেত্রে চীনা ও জাপান বা কোরীয় লিপি চিত্রের অনুসঙ্গ হিসেবে এখনও টিকে আছে। আর আরবি লিপি নিজেই একটি জীবন্ত শিল্পকলা হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ধারা এবং আধুনিক শিল্পকলা হিসেবে প্রবহমান।
বাংলা ভাষা লিখতে বিভিন্ন লিপির ব্যবহার
এ অঞ্চলে মুসলিম ও ইংরেজ আমলে আরবি, ফারসি বা উর্দু হরফে বাংলা লেখা ছাড়াও সিলেটি, নাগরি, কায়েথি, উড়িয়া, নেওয়ারি, রোমান ও আসামি লিপিতে বাংলা গ্রন্থ রচনার নজির রয়েছে।

মুসলিম আমলে মুসলিম এবং হিন্দু লেখক নির্বিশেষে আরবি-ফার্সি হরফে বাংলা পুথি লিখেছেন।  ঢাবি’র পুথিশালায় রক্ষিত আরবি হরফে লেখা বাংলা ভাষার তেত্রিশটি পুথির কথা জানা যায়। এর অধিকাংশের লিপিকালের হদিস নেই। তবে গবেষকরা বলছেন, এগুলো ১৮ শতকের আগে লেখা। এগুলি সৈয়দ সুলতানসহ অপরাপর মুসলিম লেখকদের রচিত। বাঙলা ভাষার পুথি আরবি হরফে কেন লেখা হল? ইতিহাসে দেখা যায়, সুলতানি আমলে(১২০৪-১৫২৬ ইসায়ি) প্রাপ্ত প্রায় সব শিলালিপি বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও উৎকৃষ্ট আরবি ক্যালিগ্রাফিতে করা হয়েছে। সুতরাং সাধারনের কাছে আরবি ভাষা সহজপাঠ্য ও গ্রহনীয় ছিল। এই তেত্রিশটি পুথির প্রায় সবক’টি ধর্মীয় বিষয়ে লেখা। জনগণের চাহিদা মোতাবেক এবং পাঠের সুবিধার্থে এগুলো আরবি হরফে লেখা হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।
আর ৬০দশকের শেষ দিকে চট্টগ্রামে জুলফিকার আলি আরবি-ফার্সি(উর্দু) লিপিতে একটি বাংলা পত্রিকাও বের করতেন বলে জানা যায়।
প্রাচীন কাল থেকে বলা যায়, ইসায়ীপূর্ব তিন হাজার বছর থেকে বাংলা লিপি যাত্রা শুরু করেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলা ভূখণ্ডের বাইরের ব্রাহ্মী লিপি থেকে বাংলা লিপির উৎপত্তি। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা ভূখণ্ডের ভেতর থেকেই এ লিপি ‘নাগরী লিপি’ বা ‘ব্রাহ্মী লিপি (যা থেকে নাগরী লিপির জন্ম বলে দাবি করা হয়) থেকে জাত নয়; বরং তা স্বাধীনভাবে উদ্ভূত। আরও জানা যায়, ‘বাংলা’ লিপি ব্রাহ্মণদের হাতে তৈরি নয়, এ দেশের-ই প্রাচীন আমলের সাংখ্য-যোগ-তন্ত্রবাদী বা তাদেরও পূর্বপুরুষদের-ই মহান কীর্তি। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, আরবি, সংস্কৃত ইত্যাদি বর্ণমালার প্রত্যেকটি হচ্ছে, একেকটি ‘দেবাক্ষর’। প্রত্যেকটি আরবি হরফের যেমন এক একজন অধিপতি ফেরেশতা আছে বলে কল্পনা করা হয়েছে; তেমনি প্রত্যেকটি সংস্কৃত বর্ণেরও আছে এক একজন অধিপতি দেবতা। একইভাবে ‘বাংলা’-বর্ণেরও যে প্রতিটিরই এক একটি দেবতা বা দেবী আছে,  নতুন এ তথ্যটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাই বর্তমান সময় থেকে অতি নিম্নস্তরের ভারতীয় বাঙালি এবং বাংলাদেশি বাঙালিরা (মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে) দাবি করতে পারবে, সংস্কৃত লিপির মতো বাংলা লিপিও ‘দেবাক্ষর’ এবং ‘ধর্মাক্ষর’ও বটে। আর তা ব্রাহ্মণদের নয়; তাদের-ই প্রায় তিন হাজার বছর আগেকার পূর্ব পুরুষের অবদান।


প্রাচীন বাংলা লিপির প্রতিটি বর্ণের একটি চমৎকার বর্ণনা আমরা খুজে পেয়েছি 'বর্ণোদ্ধার তন্ত্র' ও 'কামধেনু তন্ত্র' নামক দু'খানি প্রাচীন গ্রন্থে। যদিও সেখানে বাংলা লিপি কথাটার সরাসরি উল্লেখ নেই। কিন্তু বর্ণনা ভঙ্গি ও অক্ষরের আকৃতি রূপায়ণে তা বাংলা লিপি বলে চিহ্নিত করেছেন গবেষকগণ।
বই দুটিতে 'প্রাণ-তোষিণী' নামক তন্ত্রের ভিত্তিতে বিবৃত নামোল্লেখহীন লিপির 'স্বর' ও 'ব্যঞ্জন বর্ণে'র ধর্মীয় মহিমা, আকারগত বিবরণ এবং 'বাংলা' ও অন্যান্য পার্শ্ববর্তী প্রাচীন লিপির সঙ্গে তুলনা কি রকম হতে পারে তা আমরা দেখতে পারি।

১. ক. কামধেনুতন্ত্রে (প্রথম পটলে)- 'অ'

'
হে বরাননে! অ-কারের অতি গোপনীয় তত্ত্ব শোন। শরৎকালের চাঁদের মতো (এ বর্ণ) সর্বদাই পঞ্চকোণময়। পঞ্চদেবময় (এ বর্ণ) শক্তি সমন্বিত। স্বয়ং কৈবল্যমূর্তির অনুরূপ (এ বর্ণ) সগুণ ও নির্গুণযুকাত। দ্বিবিন্দুযুক্ত (এ বর্ণ) নিজেই প্রকৃতি রূপিনী।'

অর্থ- ওহে সুন্দর মুখবিশিষ্ট্যা(দূর্গা, উমা দেবী)! বাংলা অ- অক্ষরের গোপন দর্শন/কথা শোন। বাংলা ঋতুর তৃতীয় ঋতু শরৎকালে যে পূর্ণ চাঁদ ওঠে, সেটার মত "অ" অক্ষরটি সব সময় পাঁচকোনা বিশিষ্ট। পাঁচ দেবতা(দূর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ) শক্তি এর মধ্যে নিহিত। এটা নিজেই শিব মুর্তির মত, এতে গুণ যেমন আছে, আবার তা নেইও। এই অক্ষরে দুটো বিন্দু বা পুটলি আছে, এজন্য এটা প্রকৃতি(দেবী) রূপ সাদৃশ্য।


খ. বর্ণোদ্ধারতন্ত্র- 'অ'

'
ডান দিকে কোঁকড়ানো (ও) বাঁকানো এবং বাম দিকে প্রসারিত; তার উপরে যুক্ত রেখা। ডাইনে, উপরে শংকর (অবস্থিত)। বিধি নারায়ণ ও তথায় ক্রমানুসারে স্থিত। অর্ধমাত্রা, শক্তির ধানস্থ রূপ বলে কথিত ।।অ।।


অর্থ- এই 'অ' অক্ষরের ডানদিকে কোঁকড়ানো(গোলায়িত) আর বাঁকানো এবং বাম অংশ প্রসারিত। অক্ষরটির উপরে একটি মাত্রা আছে যা অক্ষরের সাথে মিলানো। ডাইনে, উপরের দিকে পেঁচানো চন্দ্রবিন্দুর মত শিব চিহ্ন আছে(প্রাচীনকালে এরকম ছিল, এখন নেই)। শিবের নিয়ম অনুযায়ী তা যথাস্থানে রাখা হয়েছে। তবে এর উপরের মাত্রাটি অর্ধেক হবে, যেটা শক্তি অর্থাৎ শিবের ধ্যানমগ্ন রূপ বলে প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলা অক্ষর নিয়ে বাঙালদের ঐতিহ্যচিন্তা এ ভাষার প্রথম পথচলা থেকে শুরু হয়েছে। শুধু প্রয়োজন বলে কথা নয় হৃদয়ের আকুতি এর সাথে মিশে আছে। প্রাচীন পুথিপত্রে লেখাকে সুন্দর আর অলঙ্কার মণ্ডিত করার প্রয়াস বাঙাল ভূখণ্ডে প্রবলভাবে ফুটে ওঠে মধ্যযুগে।
ছাপার হরফে বই আসার পরেও প্রচ্ছদ আর ভেতরের ইলাস্ট্রেশনে বাংলা হরফের শিল্পিত ব্যবহার চালু রয়েছে। কিন্তু হরফ দিয়ে শিল্পকলা করার আবেগ আর স্পৃহা একেবারে হাল আমলের। আমাদের চারুকলায় বাঙলা হরফ দিয়ে লিপিকলা বা ক্যালিগ্রাফি করার কোন ট্রেডিশন দেখা যায় না। বিচ্ছিন্ন দু'একটা কাজ যা আছে তাতে এর প্রতি গভীর অভিনিবেশ প্রায় শুণ্যের কোঠায়।
বাংলা ক্যালিগ্রাফির বর্তমান যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে দুটো প্রধান চরিত্র রয়েছে। এক. বইপত্রে প্রচ্ছদ এবং ইলাস্ট্রেশন দুই. লিপিকলা।
বইয়ের প্রচ্ছদে শিরোনাম ক্যালিগ্রাফি স্টাইলে লেখার ক্ষেত্রে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী হচ্ছেন অগ্রনায়ক। তার তুলির টানে হরফের শিল্পিত অবয়ব একটি ধারার সৃষ্টি করেছে। এ ধারায় যারা কাজ করেছেন তারা প্রায় সবাই চারুকলার।
প্রায় একই রকম হরফের বলিষ্ঠভাব নিয়ে শিল্পী হাশেম খানের তুলির টানে অন্য একটি ধারা দেখা যায়। তবে হাশেম খানের হরফে একটা গ্রামীণ সরল ভাবের সাথে শিশুর সরলতার অসাধারণ বৈশিষ্ট্য অন্যদের মাঝে দেখা যায় না।
আর বাংলাবাজারে ধর্মীয় বইপত্র এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য লেখা বইয়ে আরবি হরফের আদলে বাংলাহরফে ক্যালিগ্রাফিরও দেখা মেলে।
হাতে লেখা সাইনবোর্ড ও দেয়াল লিখন :

এখন আর হাতে লেখা সাইনবোর্ড প্রায় দেখা যায় না। দুই দশক আগেও চমৎকার আর্টিস্টিক বাংলা হরফে সাইনবোর্ড লেখা হত। হরফে আলোছায়া আর উচুনিচু ভাবের সাথে শিল্পিত ছোয়া ছিল অসাধারণ। তেমনিভাবে দেয়াল লিখন আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। বামপন্থীদের দেয়াল লিখনে যে শিল্পিত রূপ ছিল তা অন্যদের বিমোহিত করত। এছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র শিবিরের দেয়াল লিখনে হরফের প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য আলাদা হলেও তা দৃষ্টি নন্দন ছিল।
একুশে উদযাপন উপলক্ষে শহীদ মিনারের আশেপাশের দেয়াল লিখন এক সময় এত বিচিত্র আর মান সম্পন্ন ছিল যে সৌন্দর্যপিপাসুরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে তা নয়ন ভরে দেখত। চারুকলার ছাত্ররা বরারবর এই লেখাকে তাদের প্রেস্টিজ ইস্যু মনে করত। এখন আর সেই মান নেই।
এক সময় দেয়াল পত্রিকা পাড়া মহল্লায়ও বের করা হত। এখন শিক্ষাঙ্গন থেকেও তা প্রায় হারিয়ে গেছে। এসব লেখালেখিতে হরফকে সুন্দর করার যে প্রয়াস ছিল তাতে শিক্ষিত মাত্রই সুন্দর হাতের লেখার একটা গুরুত্ব ছিল। আর এখন অধিকাংশ ছাত্রের হাতের লেখা দেখলে বাংলা হরফের প্রতি ভালবাসা দূরে থাক যেন হরফকেই তারা ভুলতে বসেছে।
এই চিত্রের উল্টোদিকও আছে। বাংলা হরফে ক্যালিগ্রাফি করার একটা প্রয়াস ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। পেইন্টিংয়ে হাশেমখান, কাইয়ুম চৌধুরী আর আবদুস সাত্তার বাংলা হরফকে অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করছেন। চারুকলার সাম্প্রতিক কাজেও তা প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে বলা যায় একাডেমিক শিল্পচর্চার বাইরে কিছু শিল্পী তাদের শিল্পকর্মকে বাংলা ক্যালিগ্রাফি হিসেবে তুলে ধরার আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের কাজে অভিনিবেশ আর কঠোর সাধনা লক্ষ্য করা যায়।
এসব বাঙলা ক্যালিগ্রাফিতে ধর্মীয় ভাব প্রাধান্য পেয়েছে টেক্সট ব্যবহারের ক্ষেত্রে। তাছাড়া দেশ মাতৃকা ভাষার প্রতি কমিটমেন্টও এসব কাজে দেখা যায়। তবে ক্যালিগ্রাফিতে শিল্পমানে কোন ছাড় দিতে রাজি নয় এসব শিল্পী। সাইফুল ইসলাম, ইব্রাহীম মণ্ডল, আরিফুর রহমান, আবদুর রহীমসহ প্রায় শতখানেক শিল্পী বাংলা ক্যালিগ্রাফির একটি নতুন ধারা দাড় করিয়ে ফেলেছেন।
বাংলা টাইপোগ্রাফি :
ছাপার অক্ষর এক সময় সীসার ব্লক আর কাঠের ব্লকে হত। গত ‘৮০ দশকেও সেটা রমরমা ছিল। লেটার হেড বা কোন শিরোনাম একটু ব্যাতিক্রম বা কোন ইমেজ ছাপাতে হলে জিংক ব্লকের দ্বারস্থ হতে হত। এরপর টাইপরাইটারে এল মুনির কীবোর্ড। তারপর মোস্তফা জব্বার কম্পিউটারের জন্য মেয়ের নামে সুতন্বি- তন্বি ফন্ট আনেন। এখানে তিনি অনুঘটকের কাজ করেছেন, কারিগরি বা ফন্ট তৈরিতে তার হাত ছিল না। হামিদুল ইসলাম তখন দৈনিক সংগ্রামের স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে নয়াদিগন্তে আছেন। তিনি জব্বারের অফিসে গিয়ে দিনের পর দিন হাতে ফন্ট বানিয়েছেন। তখন স্ক্যানার আসেনি। সুতরাং মনিটরের স্ক্রিনে আন্দাজের ওপর পাথ করার কাজ করতে হত। এতে ফন্ট যথার্থ হচ্ছিল না। প্রিন্ট দিলে হাতে আকা ফন্টের সাথে মিলে না। ফলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। একদিন শিল্পী হামিদুল ইসলাম বাটার পেপার দেখে নতুন আইডিয়া পেলেন। আবার কাজ শুরু হল। তিনি বাটার পেপারে ফন্ট একে দেন এবং সেটা মনিটরে কসটেপ দিয়ে লাগিয়ে হরফ পাথ করা হল। এবার প্রিন্টে মনমত টাইপ বের হল। এই অতি পরিশ্রমের মূল্য ছিল মাত্র বিশ হাজার টাকা। এরপর তো প্রযুক্তির কল্যাণে আরো কত ফন্ট বের হল।
আগেই বলা হয়েছে, বাংলা ফন্টের স্বভাব বর্গাকার বা চারকোনা স্বভাবের। সব হরফ আনুভুমিক সমান মাপের নয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে হয়েছে। এই উপমহাদেশের প্রধান ভাষাগুলোর মধ্যে অধিকাংশেরই নিজের লিপি নেই। যেমন- উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত। উর্দু লেখা হয় আরবি হরফে আর হিন্দি-সংস্কৃত লেখা হয় নাগরিতে। সিলেটে একসময় নাগরি লিপিতে সমৃদ্ধ সাহিত্য ছিল। সেক্ষেত্রে বাংলা(বাঙলা, বাঙালা, বাঙ্গালা) ভাষার নিজস্ব লিপি থাকায়, এর মর্যাদা ও গৌরব অন্যদের থেকে বেশি। বাংলা ফন্ট ক্রমান্বয়ে দৃষ্টি নন্দন করতে এর অবয়বে পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৭৭৮ ইসায়িতে হ্যালহেডের বাঙ্গালা ব্যকরণ ছাপার মাধ্যমে বাঙ্গালা হরফে ছাপার প্রযুক্তি হুগলি থেকে শুরু হয়। ছাপার প্রযুক্তির আগে বঙ্গে ও বাংলাদেশে হাতে বই লেখা হত। সে ক্ষেত্রে বঙ্গের তুলনায় বাংলাদেশের লেখকদের ফন্ট ও শৈলি উৎকৃষ্ট মানের ছিল।


বাংলা পুথির লিপির চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ও শৈলি নিয়ে বেশ মজার তথ্য পাওয়া যায়। টানা হাতের লেখায় বিশেষ করে তাল পাতায় লেখা পুথিতে শব্দের পর শব্দে কোন ফাক রাখা হত না এক শব্দের শেষ হরফের মাত্রা পরের শব্দের সাথে মিলে যেত। ল ও ন প্রায় একই রকম হত। ই-কার এ-কারের মত হত। ঈ-কারের উড়ানি এবং ঋ-কারের উড়ানি লম্বা এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দেখা যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ১৪ শতকের কোন পুথির লেখার শৈলির মান ১৮শতকের থেকে উৎকৃষ্ট ছিল। আসলে পুথি লেখক অর্থাৎ পুথির কপি লেখক শিল্প মনোভাবাপন্ন হলে তার লেখা হত উৎকৃষ্ট।
এখন চারুকলায় বিশেষ করে প্রাচ্যকলায় বাংলায় যে ক্যালিগ্রাফি চিত্রকর্ম করা হচ্ছে, সেগুলো রেখা প্রধান এবং ছবির অনুসঙ্গ ও ভাবের সাথে মিল রেখে করা হয়। তা ছবি হল কি না, সেটাই মূল কথা। ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফি চর্চা এখানে গণ্য নয়। তাহলে দেখা যেত কঞ্চি বা বাশের কলম দিয়ে বাংলা হরফ লেখা ও ক্যালিগ্রাফি করা হচ্ছে। আর সেটা একটা নির্দিষ্ট নিয়ম কানুনের ব্যাপারও বটে। কারন আরবি হরফ ডান থেকে বামে লেখা হয়, সেজন্য এর কলমের মাথার স্ট্রোক ডান দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোন বরাবর থাকে, অন্যদিকে বাংলা বাম দিক থেকে ডান দিকে লেখা হয় বলে এটার কলমের মাথার স্ট্রোক বাম দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোন বরাবর থাকে।

এবার প্রশ্ন হতে পারে, ক্যালিগ্রাফি আর হ্যাণ্ড রাইটিং বা হাতের লেখার ভেতর কি পার্থক্য আছে?

ক্যালিগ্রাফি, হ্যাণ্ড রাইটিং থেকে আলাদা এজন্য যে, ক্যালিগ্রাফি একই সাথে শিল্পতৃষ্ণা এবং আটপৌরে জীবনের প্রয়োজন মেটায়।

অন্যদিকে, হ্যাণ্ড রাইটিং হচ্ছে যোগাযোগ বা শুধু প্রয়োজনকে তুলে ধরে। নন্দন বা সৌন্দর্য সেখানে গৌণ।


ক্যালিগ্রাফি চর্চাকরা হয় এর ভেতরের সৌন্দর্য এবং অন্তরনিহীত শিল্পকে তুলে ধরতে।

ক্যালিগ্রাফি এবং হ্যাণ্ড রাইটিংয়ের মধ্যে আরেকটা মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, উপায় উপকরণের ভিন্নতা। ক্যালিগ্রাফি করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি কলম ব্যবহার করা হয়। আর সাধারণ লেখায় যে কোন কলম হলেই চলে।


আরবি ক্যালিগ্রাফি কলমকে 'কলম খাশাব' এবং 'কলম বুস' বলে।

ক্যালিগ্রাফি করার জন্য বিশেষ কিছু নিয়ম এবং পদ্ধতি মেনে চলতে হয়। যেমন একটি লিপিতে অলঙ্কার ব্যবহার হয় আবার দেখা যায় আরেকটি লিপিতে তা নিষিদ্ধ এবং আকার-আকৃতি একেক লিপির একেক রকম। বাংলা ট্রেডিশনাল ক্যালিগ্রাফিতেও নিয়ম-নীতি রয়েছে এবং এতে মাথা তেরছা করে কাটা ক্যালিগ্রাফি কলম ব্যবহার হয়।

ক্যালিগ্রাফির লিপির মধ্যে এই বৈচিত্র এসেছে সংস্কৃতি, ধর্ম এবং শিল্পবোধের প্রাত্যাহিক চর্চার মাধ্যমে।
বাংলা ক্যালিগ্রাফির ট্রেডিশনাল ধারা সাংখ্য-যোগ-তন্ত্রবাদী আমলে ধর্মীয় দেব-দেবী আশ্রিত থাকার কারণে তা গোপন তান্ত্রিক চর্চায় ব্যবহৃত হত। এটির হরফ সুন্দর করার প্রয়াস পাল আমলের পুথিতে পাওয়া যায়। কিন্তু বহিরাগত কনৌজাগত সেনরা বাঙলা ভুখন্ড দখল করে একে ভুতলিপি নাম দিয়ে বাংলা ভাষা ও লিপি ধবংস করে এবং সংস্কৃত ভাষা ও নাগরি লিপি প্রতিস্থাপন করে। ফলে বাংলা লিপি অন্ধকারে চলে যায়।১২শতকে বখতিয়ার খিলজি বাংলা ভুখন্ড অত্যাচারী সেনদের হাত থেকে বিনা রক্তপাতে উদ্ধার করলে বাংলা ভাষা ও লিপি হৃত গৌরব ফিরে পায়।বাংলার স্বাধীন সুলতান ও মোগল আমলে মুসলমান এবং হিন্দু পুথি লেখকদের প্রচেষ্টায় লিপির উন্নয়ন ও সংস্কার সাধিত হয়। পঞ্চাশটি বাংলা হরফকে উচ্চারণগত সুবিধার জন্য এবং আরবি হরফের সাথে সামঞ্জস্য ও সমন্বয় করার উদ্দেশ্যে মাত্র আঠারটি বাংলা হরফ চালু করে এবং এই আঠারটি হরফ দিয়ে মুসলিম পুথি লেখকরা পুথি রচনা করেছেন। এই হরফগুলোর মধ্যে তিনটি স্বরবর্ণ, যেমন-আ, ই, উ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ পনেরটি, যথা-ক, খ, গ, ছ, জ, ত, দ, ন, ফ, ব, ম, র, ল, স, হ।
১৮ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ হওয়ার আগে ও পরে বাংলা লিপিকে সংস্কৃত লিপির আদলে লেখার ও প্রতিস্থাপন করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে গৌড়-বঙ্গ তথা ঘটি ব্রাহ্মনেরা। এজন্যও বাংলা লিপির উৎকর্ষতা আসেনি। এর আরো একটি কারণ হলো “ক-অক্ষর গোমাংস” থিউরী। আর্য ব্রাহ্মণেরা বাংলা লিপিকে গোমাংস অর্থাৎ গরুর গোস্তের সাথে তুলনা করে একে অচ্ছ্যুৎ ঘোষণা করে। মুসলিম আমলে সংস্কৃত ভাষা ও নাগরি লিপি বাদ দিয়ে বাংলার মুসলমানরা এর উন্নয়ন ও সংস্কার করার ফলে ব্রাহ্মণেরা এই হীন ষড়যন্ত্র করে। আর ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে বাংলা হরফকে পেছনের দিকে নিয়ে যায় এবং এর ক্যালিগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য ব্যাহত হয়।
পাকিস্তান আমলে বাংলা লিপির তেমন অগ্রগতি হয়নি, এমনকি শিল্পী-সাহিত্যিকরা যেমন এর প্রতি আদর-কদর নেননি, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি বরং বাংলা ভাষার প্রতি বিমাতা সুলভ আচরণ করা হয়েছে। এতে বাংলা ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নের কোন হদিস পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে বাংলা ক্যালিগ্রাফি নিয়ে পেইন্টিংয়ের দেখা মেলে ’৮০ দশকে শিল্পী সাইফুল ইসলামের প্রদর্শনীতে। তারপর ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি ও ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র আয়োজিত দশক ব্যাপী প্রায় ডজনখানেক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীতে অসংখ্য বাংলা ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্ম স্থান পায়। এছাড়া ‘বাংলা ক্যালিগ্রাফি’ শিরনামে ২০০০, ২০০৩ ও ২০০৫ সালে তিনটি প্রদর্শনী হয়েছে। এসব প্রদর্শনীতে বাংলা হরফকে ক্যালিগ্রাফিক মানে উন্নীত করতে আরবি কুফি, সুলুস, নাসখী শৈলীর আদলে যেমন প্রয়াস চালাতে দেখা যায়, তেমনি উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হরফকে বিকৃতি ও মাথাভারী করতে দেখা যায়। এছাড়া শুধুমাত্র ক্যালিগ্রাফি কলম দিয়ে কোন বাংলা ক্যালিগ্রাফির উপস্থাপন ছিল না। চারুকলা থেকে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা পেইন্টিংয়ের ভাব বজায় রাখতে গিয়ে ক্যালিগ্রাফির মৌলিক বিষয়কে গৌন করেছেন। তবে যারা বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফি নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন তাদের কথা উপরে বলা হয়েছে।তারা যে একটি স্বতন্ত্র ধারা দাড় করিয়ে ফেলেছেন।তা সম্প্রতি তাদের কাজে প্রকাশিত হয়েছে।
 
শুধুমাত্র বাংলা ক্যালিগ্রাফি নিয়ে এখনও কোন বইয়ের খোজ মেলেনি। এবিষয়ে পত্র-পত্রিকায় যেসব লেখালেখি দেখা যায় তার কয়েকটির শিরনাম হচ্ছে-
এক. বাংলা ক্যালিগ্রাফি: সম্ভাব্যতা ও চলমান ধারা, মোহাম্মদ আবদুর রহীম, দৈনিক সংগ্রাম, ৯ মে, ১৯৯৭।
দুই. বাংলা বর্ণমালায় ক্যালিগ্রাফি, আরিফুর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০০২।
তিন. বাংলা ক্যালিগ্রাফি ও ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক ভাবনা, মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম, স্মারক ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি, ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র, জুলাই, ২০০২।
চার. নান্দনিক শিল্প ক্যালিগ্রাফি : বাংলাদেশে এর চর্চা প্রসঙ্গে, ড. মো. রফিকুল আলম, বাংলা ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী ক্যাটালগ, বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি একাডেমী, এপ্রিল, ২০০৩।
পাঁচ. বাংলা ক্যালিগ্রাফির শিল্পচিন্তা, আসাদ রহমান, ক্যালিগ্রাফি, বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি একাডেমীর ত্রৈমাসিক পত্রিকা, জুন, ২০০৬।
ছয়. মুবাশ্বিরের বাংলা ক্যালিগ্রাফি লোকজ নিবিড় আঁধারে, মানাম মায়মুন, ক্যালিগ্রাফি, বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি একাডেমীর ত্রৈমাসিক পত্রিকা, জুন, ২০০৬।

সাত. বাঙলা ক্যালিগ্রাফি : ভিন্ন এক শিল্প আলেখ্য, শেখের পো, শেখেরপো.ব্লগস্পট.কম, ৯ মার্চ, ২০১২।

আট. বাংলা ক্যালিগ্রাফি – স্বগত কথন, আনোয়ার সেলিম, বাঙালিয়ানাম্যাগাজিন.কম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪।
প্রসঙ্গ: খত থেকে দস্তখত
বাংলায় পেচানো বা স্ক্রীপ্ট আকারে নাম সই বা সিগনেচারকে বাংলা ক্যালিগ্রাফি বলে মত দিয়েছেন ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, এটা তার আবিস্কার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকগণ এটাকে তাদের একাডেমিক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করবেন বলে তিনি দাবি করেছেন। তিনি ‘নাম দস্তখত’কে সহি এবং ‘দস্তখত’কে শিল্পিত লিপিকলায়(Calligraphic System) অন্তর্ভুক্ত করেছেন। লিপিকলার বিকাশে দস্তখত একটি অনুকরনীয় মডেল এবং নান্দনিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দস্তখতকে ফ্রিহ্যান্ড শিল্প বিবেচনায় এক একটা শিল্পকর্ম এবং এর নির্মাতারা স্থুল অর্থে এক একজন শিল্পী বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। তিনি খত শব্দটি আরবি এবং একে শিল্প মন্ডিত লিপিকলা বলেছেন। আর দস্ত শব্দটি ফারসি এবং এর অর্থ হাত বলেছেন। দস্তখতের অর্থ করেছেন সহি বা স্বাক্ষর।
এখানে মজার বিষয় হল, আরবি এবং ফারসিতে স্বীকৃত ক্যালিগ্রাফারগণ একটি ক্যালিগ্রাফিক স্বাক্ষর ওস্তাদের কাছ থেকে পাশ করার পর বা ইযাজা লাভের পর ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্মের নীচে দিয়ে থাকেন এবং সেখানে লেখা হয়, ‘কাতাবাহু আবদুল্লাহ/ওমর/নাম’। ‘কাতাবাহু’ শব্দটা শুধুমাত্র ইযাজা লাভের পরই দেয়া যায়, অন্যথায় শুধু নাম সই করা যায়। এই বিষয়টাকে আরবিতে ‘তাওকি’ বলে। হাজার বছর ধরে এই সিলসিলা বা নিয়ম চলে আসছে। এটা ফারসী ক্যালিগ্রাফির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফার্সিতে ক্যালিগ্রাফিকে বলে ‘হুনারমান্দে খোশনবিশি’ বা ‘হুনারে খোশনবিশি’ আর কেতাবাত বা সাধারণ হস্তলিপিকে বলে ‘খতাতি’। আধুনিক ফার্সিতে সিগনেচারকে ‘আমেদা’ বা ‘নামে আমেদা’ বলে। দস্তখত শব্দটি আসলে প্রাচীন তুর্কি-আফগান-কুর্দি রুটের শব্দ। এর অর্থ ‘ক্যালিগ্রাফিক স্বাক্ষর’ নয়। তাহলে এসব অঞ্চলের ক্যালিগ্রাফির বই-পত্রে অবশ্যই থাকত এবং সেটা প্রচলিত হিসেবে এখনও পাওয়া যেত। কারণ ক্যালিগ্রাফিতে সিগনেচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন বাংলায় শুধু পেচিয়ে সিগনেচার দিলে সেটা ক্যালিগ্রাফি বলতে হবে, তা বিবেচ্য হতে পারে না। কারণ ঐ সিগনেচারের অধিকারীর স্বীকৃত বাংলা ক্যালিগ্রাফি শিল্পী বা ক্যালিগ্রাফার হিসেবে পরিচিতি থাকতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলাম কখনই ক্যালিগ্রাফার হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। আর আরবিতে খত অর্থ শুধু ক্যালিগ্রাফি নয়; লাইন, পথ, দাগ, রেখা, চিহ্ন ইত্যাদি অর্থও হয়।  যেমন- আকাশপথকে বলে খত আল জাউবি। বিমান সংস্থার নামকে যেমন-কাতার এয়ার লাইনস’কে বলে খুতুত আল জাউবিয়া আল কাতারিয়া।
আরহামের পিকটোগ্রাফি:
আরহামুল হক চৌধুরী বাঙলা হরফকে নানান রকম পেচিয়ে বাকিয়ে যেকোন বস্তু বা প্রাণীর চিত্র একেছেন। তার কাজে প্রবাদ প্রবচন এসেছে চিত্রের অবয়ব তৈরিতে সাচ্ছন্দ্যরূপে। ছবির আবেদনের সাথে অবয়ব এবং টেক্সট মিলে একাকার হয়ে গেছে। এধরণের নিরীক্ষাধর্মী কাজে ঐতিহ্যকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। যা কিছুটা নগর জীবনের বিলাসের ভেতর লোকশিল্প ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। এ পর্যন্ত তার বিভিন্ন মাধ্যমের ১১টি একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে হাতে আঁকা ও নক্সা করা আসবাব, ভেষজ রঙ নিয়ে কাজ, উচ্ছিষ্ট লোহার ভাস্কর্য থেকে দেশীয় গাছের বনসাইও রয়েছে।
শিল্পীর ক্যালিগ্রাফি কাজে পুরনো বাংলা বচন ও স্লোক এর ব্যবহার করা হয়েছে এবং লেখাটি সেই প্রক্রিয়ায় একটি আদলে পরিনত করা হয়েছে। কাজগুলো ইরানি ‘তুগরা’ ঘরানার রীতিতে প্রভাবিত কিন্তু মুল প্রতিপাদ্য আদি বাঙ্গালিয়ানায় গ্রথিত। দেশীয় প্রবচন এবং আদল বাংলা ক্যালিগ্রাফিগুলোতে একটি বিশেষ বাংলা চরিত্র দিয়েছে।
সচেতনভাবে বাহুল্য বর্জন করে শুধুমাত্র বচনকে প্রাধান্য দিয়ে কাজগুলো করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ৫২ কে মুখ্য করে ৫২টি নানান ধরণের কাগজে করা নতুন ক্যালিগ্রাফি কাজ সে করেছে।
বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে কুরআনের অনুবাদ:
২০১৪ সালের রমজান মাসে পবিত্র কুরআনের ত্রিশ নম্বর পারার অনুবাদ বাংলা ক্যালিগ্রাফি করেন মোহাম্মদ বেলাল। একাজে তিনি আর্ট কাগজের ওপর তেরছা মাথার ক্যালিগ্রাফি ফ্লাট মার্কার ব্যবহার করেন।
প্রবাসে বাংলা ক্যালিগ্রাফি:
বাংলাদেশের মেয়ে সিলভিয়া রেশমিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড শহরে বাংলা ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী করেন।নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত সেখানে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়। সেখানে তাঁর সব কটি ছবি দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতাদের মধ্যে তিনজন জাপানি তো রীতিমতো আপ্লুত হয়ে যান আবেগে। তাদের কাছে মনে হয়েছিল— এই প্যাচানো বাংলা অক্ষরগুলো জাপানি অক্ষরের মতো, কিন্তু জাপানি নয়। এটা একটা ভিন্ন ভাষা কিন্তু ভিন্ন ভাষাকেও তাদের আপন মনে হয়েছিল।
বাংলা ক্যালিগ্রাফি ট্রেডিশনাল এবং পেইন্টিং, এই দুই ধারা একটি পর্যায় এসে দাড়িয়েছে।
সুতরাং বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে উন্নতি করতে চাইলে প্রাচীন পুথির লেখন বৈশিষ্ট্যকে আয়ত্ব ও যাচাই করতে হবে। আরবি হরফের বৈশিষ্ট্য বাংলা হরফে প্রয়োগ করার চেষ্টা হবে আত্মঘাতি ও কাকের ময়ুরপুচ্ছ ধারণের মত নিঃষ্ফল প্রয়াস। এর উন্নতি ও সংস্কারে শিল্পী, ক্যালিগ্রাফার ও সংশ্লিষ্টদেরকে সচেষ্ট হতে হবে। বাংলা ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ খোলা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অতীব প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি।
----------------------------
লেখক : ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগে পিএইচডি গবেষক।

Tuesday, June 2, 2015

calligraphy of kaaba কাবা শরীফের ক্যালিগ্রাফি




-মোহাম্মদ আবদুর রহীম
হজ্জ-ওমরা পালনে পবিত্র মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গনে পৌঁছে হাজীগণের হৃদয় জুড়িয়ে যায় কালো গিলাফে আবৃত কাবা শরীফ অবলোকন করে। এক অপার্থিব ভালো লাগা জড়িয়ে ধরে গিলাফে উৎকীর্ণ সোনার সুতোয় বোনা ক্যালিগ্রাফি দেখে। কাবার ভেতরে-বাইরে এই অত্যাশ্চর্য ক্যালিগ্রাফির প্রতি মানুষের আকর্ষণ অপরিসীম ও চিরন্তন।
গত ফেব্রুয়ারি’২০১৫ আল্লাহর অসীম করুণা ও রহমতে পবিত্র কাবা জিয়ারত ও ওমরা পালনের সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রায় সপ্তাহ খানেক মক্কায় অবস্থানকালে আশ-পাশের দর্শনীয় স্থান দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন ক্যালিগ্রাফার হিসেবে পবিত্র দুই মসজিদের স্থাপত্য নিদর্শনের মহামূল্যবান প্রদর্শনি দেখতে পেরে আনন্দ ও জ্ঞান লাভ করেছি। ঐ প্রদর্শনিতে কাবা ঘরের শত শত বছরের প্রাচীন ক্যালিগ্রাফির অংশবিশেষ ছিল। গিলাফ-দরোজা-দেয়াল-মিহরাব-মিম্বর-থাম ইত্যাদি প্রত্যেক স্থানের আরবি ক্যালিগ্রাফির অসাধারণ নিদর্শনের সংরক্ষিত অংশ প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। আরও ছিল হাতে লেখা কয়েকশ বছরের প্রাচীন কুরআন।  কপিকলসহ জমজম কূপের উপরের অংশ, মাকামে ইব্রাহীমের ভেতর পাথরের ওপর পায়ের ছাপের আদলে রূপার আচ্ছাদন ও বাইরের ঘর, হজরে আসওয়াদের ওপরের পেতলের এবং রূপার আচ্ছাদন, গিলাফ বোনার হাতে চালানো তাত, পাথরের পিলার, প্রায় হাজার বছরের পুরনো কাঠের স্তম্ভ,  কাবার মূল খুটি হিসেবে যেটার ব্যবহার হয়েছিল।
রাসূলের সা. সময় কাবার গিলাফে ক্যালিগ্রাফির কথা জানা যায় না। তবে ৪০ হিজরী মক্কা ও তায়েফে প্রাপ্ত উৎকীর্ণলিপি থেকে জানা যায়, আরবি ক্যালিগ্রাফির তখন বেশ উন্নত স্টাইল প্রচলন ছিল। সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উস্তাদ ড. নাসের বিন আলী আল-হারেসী এক গবেষণায় এ তথ্য জানান।
কাবার গিলাফে আরবি ক্যালিগ্রাফির নান্দনিক উপস্থাপনের বিষয়ে রিয়াদের ইমাম বিন সউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া কলেজের উস্তাদ ড. মুহাম্মদ বিন হুসাইন আল-মাওজান বলেন, ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত মতে, মিশরের মামলুক সুলতানদের আমলে কাবার ভেতর ও বাইরে আলাদাভাবে গিলাফ আবৃত করা হত এবং তাতে আরবি ক্যালিগ্রাফি দিয়ে অলঙ্কৃত করা হত। মামলুক আমলের ৭৬১ হিজরিতে সুলতান নাসের হাসান বিন মুহাম্মদ বিন কালাউনের সময় কাবার ভেতরের গিলাফের একখন্ড এখনও সংরক্ষিত আছে। তবে কাবার গিলাফের ভেতর-বাইরে উভয় অংশে শৈল্পিক এবং নয়নাভিরাম ক্যালিগ্রাফির অলঙ্করণ শুরু করেন তুর্কী ওসমানীয় সুলতানগণ। তাদের সময়ে ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে নান্দনিক শৈলি সুলুস ও জালি সুলুসের ব্যাবহার শুরু হয়। মামলুক সুলতানদের সময়ে রায়হানী ও মুহাক্কাক শৈলীর কায়রো ধারায় ক্যালিগ্রাফি ব্যবহৃত হত। তবে কাবার চারপাশে মসজিদে হারামে কুফি কাইরোয়ানী, জাহরি-নাবতি লিপির অলঙ্করণ ছিল।
 সৌদি বাদশাহ আবদুল আযীয আল সউদ ১৩৪৬ হিজরিতে গিলাফ বা কিসওয়া তৈরির একটি বিশেষ কারখানা নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং সে বছরেই অত্যন্ত মনমুগ্ধকর ক্যালিগ্রাফি সজ্জিত গিলাফ তৈরি করে কাবা ঘর আবৃত করা হয়। ক্যালিগ্রাফির শৈলি নির্ধারণের জন্য বিশ্বের নামকরা ক্যালিগ্রাফারদের এক সম্মেলন আহবান করা হয়, সেখানে সুলুস লিপিকেই সর্বসম্মত রায় দেয়া হয়। বর্তমানে গিলাফের খ্যাতনামা ক্যালিগ্রাফার মুখতার শোকদার (বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত) এ তথ্য জানান।
কাবার গিলাফের বাইরের কালো কাপড়ে স্বর্ণমণ্ডিত রেশমি সুতা দিয়ে দক্ষ কারিগর দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করা হয়। মুখতার শোকদার বলেন, ঝারনিখ কালি দিয়ে প্রথমে কাপড়ে ক্যালিগ্রাফির আউট-লাইন দেয়া হয়, তারপর কারিগরগণ হরফের ভেতর রেশমি সুতার মোটা লাইন বসিয়ে স্বর্ণের সুতা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে হরফ ফুটিয়ে তোলেন। গিলাফের কালো জমিনে স্বর্ণের সুতার ঢেউ খেলানো বুননের ক্যালিগ্রাফির সোনালি আভা এক জান্নাতি আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
বাদশাহ ফাহদ বিন আবদুল আযিযের সময় থেকে গিলাফের প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে সৌদি বংশোদ্ভুত আবদুর রহীম আমিন বুখারী দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ক্যালিগ্রাফি হিসাবে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর গুনবাচক নাম বিশেষ নকশা আকারে উপস্থাপন করা হয়। হজরে আসওয়াদের উপর অংশে আল্লাহ আকবর ক্যালিগ্রাফিসহ বর্তমানে গিলাফের অধিকাংশ ক্যালিগ্রাফি মুখতার শোকদারের হস্তলিখিত। কাবার ভেতরের অংশের গিলাফে তিরাজ নামে তেরছা ধরণের বিশেষ বুনন ও কালেমা ক্যালিগ্রাফি করা হয়।
কাবার স্বর্ণমন্ডিত ধাতব দরোজার ওপর সুলুস লিপিতে ক্যালিগ্রাফি বিদ্যমান। কাবার স্থাপত্য প্রদর্শনিতে প্রাচীন কাঠের নকশা করা দরোজায় মুহাক্কাক লিপিতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গিলাফে এবং দরোজার ক্যালিগ্রাফিতে বিভিন্ন আয়াত দিয়ে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। দরোজার তালা ও চাবি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আকৃতি এবং গঠনের, এতে সুক্ষ্মভাবে ক্যালিগ্রাফি উৎকীর্ণ দেখা যায়। এমন কি কাবা ঘরের ছাদের  ধাতব চৌকোনা আকারের পানি নিঃসরন নলটির দুই পাশে সুলুস লিপিতে কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এ নলটিও নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিবর্তন করা হয়েছে বলে পুরাতন কয়েকটি প্রদর্শনিতে  দেখা যায়।
কাবা ঘরের ভেতর চার দেয়ালে বিভিন্ন ধরণের পাথরের পাতে সুরা ও কালিমা ক্যালিগ্রাফি উৎকীর্ণ আছে। এসব ক্যালিগ্রাফিতে মুহাক্কাক, রায়হানী, সুলুস, কুফি শৈলীর ব্যবহার দেখা যায়। কাবার দরোজা দিয়ে ঢুকে হাতের ডানপাশে হাতিমের দিকের দেয়ালের ডানপাশে বাব আত-তাওবা নামে একটি দরোজা আছে। এটি ধাতব নির্মিত এবং স্বর্ণ মণ্ডিত, এতে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নাম দিয়ে সুলুস লিপিতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আযিযের নির্দেশে এতে স্বর্ণ দ্বারা প্রলেপ দেয়া হয়।
পবিত্র কাবা ঘরে কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি দিয়ে সুশোভিত করার মাধ্যমে ইসলামের আধ্যাত্মিক শিল্পকলার যাত্রা শুরু হয়। মানুষ আল্লাহ তায়ালাকে চর্ম চোখে দেখতে পায়না কিন্তু আল্লাহর বানীর এই নান্দনিক শৈলী অবলোকন করে হৃদয়ে তাকে অনুভব করে। এই বোধ মানুষকে উত্তরোত্তর স্রষ্টায় সমর্পিত ও নিবেদিত হতে প্রেরণা যোগায়।##

Thursday, April 16, 2015

মহানবীর (স.) সময়কার লেখা কুরআনের সন্ধান ও প্রসঙ্গ কথা


 

নমুনা-১
মোহাম্মদ আবদুর রহীম

 সম্প্রতি কয়েকটি পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মহানবীর (স.) সময়কার লেখা কুরআনের সন্ধান বিষয়ক খবর ও ছবি ছাপা হয়েছে। বইপত্র ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য সহজলভ্য ও যাচাইয়ের সুযোগ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সঠিক তথ্য বের করার সুযোগ হয়েছে। প্রকাশিত খবরটি সঠিক কিন্তু ছবিটি সঠিক নয়।

দৈনিক সংগ্রাম ও আরটিএনএন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছবিটি তুরস্কভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ড বুলেটিনের বরাত দিয়ে ছেপেছে।
স্ক্রিনশট-১
 ঐ সাইটটিতেও একই ছবি আছে।(স্ক্রিনশট-১) অন্যদিকে সময়ের কন্ঠস্বরসহ কয়েকটি সাইটে প্রকাশিত নিউজের সূত্র ওয়ার্ল্ড বুলেটিন দিলেও ভিন্ন ছবি ছেপেছে।(স্ক্রিনশট-২)
স্ক্রিনশট-২
 প্রকাশিত এই দুটি ছবি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলো কুরআনের পাতা ও লিপির ভেতর জের-জবর-পেশ নোকতা ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ মহানবীর (স.) সময়ে কুরআনের লিপিতে এগুলো ছিলনা। উমাইয়া খলিফা মারওয়ানের সময়ে মক্কার প্রশাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাকাফি(৬৬১-৭১৪ ইসায়ি) অনারব ও আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ পাঠকদের সুবিধার্থে কুরআনে জের-জবর-পেশ প্রয়োগ করার ব্যবস্থা করেন। সে সময় বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ খলিল ইবনে আহমদ সিরিয় লিপি থেকে স্বরচিহ্নগুলো সংগ্রহ করে কুরআনে প্রয়োগ করেন।
এছাড়া উভয় ছবিতে ব্যবহৃত ক্যালিগ্রাফি লিপিটি মাগরেবি কুফি বা আন্দালুসিয়ান কুফি। পশ্চিম আফ্রিকায় এই লিপিটি ১২-১৩ শতকে কুরআনের লিপি হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।বর্তমানেও এই লিপিতে সেখানে ক্যালিগ্রাফি করা হয়। এলিপিতে হরফের রেখাগুলো নমনীয় এবং হরফের শেষাংশ ক্রমশ চিকন হয়ে নেমে যায়। হরফের শুরুটা মোটা বৃত্তাকার বা গোলায়িত হয়।নোকতা-জের-জবর-পেশ-শাদ্দাহ স্পষ্ট এবং আয়াত শেষে ত্রিকোণাকার (মুসাল্লাস) লতা বা পেঁচানো দড়ির মত নকশা থাকে।
সুতরাং এটি নিউজের সাথে সংগতিপূর্ণ ছবি নয়। নেটে সার্চ দিয়ে আসল ছবি পাওয়া গেল। সেখানে কার্বন -১৪ ডেটিং-এর জন্য প্রাচীন ঐ গ্রন্থটির একটি ছবি দেয়া আছে।(নমুনা-১)
আলোচিত হেজাজি মায়েল কুফি লিপির কুরআন


উল্লেখ্য, জার্মানির বার্লিন স্টেট লাইব্রেরিতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর সময়কার লেখা পবিত্র কোরআনের কপির সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় শত বছর ধরে এটি এই লাইব্রেরিতে সবার অগোচরে পড়ে ছিল।
জুরিখের লাইব্রেরিতে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তিন পৃষ্ঠার চর্ম কাগজে কুফি লিপিতে লেখা নমুনাটি ৬৪৯ থেকে ৬৭৫ সালের মধ্যে হাতে লেখা হয়েছিল। তুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের “কুরানিকা প্রকল্পের” গবেষকগণ এটি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালান।
স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের খবরে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদী একটি প্রকল্পের আওতায় এটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। এজন্য ইউরোপের সমগ্র কোরআনের কপি যাচাই করে দেখা হয়।
বার্লিন লাইব্রেরিতে ১০০ বছর ধরে এই কপি সবার অলক্ষ্যে পড়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মিশরীয় এক বিজ্ঞানী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অথবা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি জার্মানিতে নিয়ে আসেন।
গবেষকরা ধারণা করছেন, গ্রন্থটি মহানবী (স.) ওফাতের ২০-৪০ বছর পরে লেখা হয়েছে। মূল গ্রন্থের অংশবিশেষ এ গ্রন্থটি ১৫৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত। সুরা বনি ইসরাইল(১৭)এর ৩৫ নং আয়াত থেকে সুরা ইয়াসিন(৩৬)এর ৫৬নং আয়াত পর্যন্ত আছে। এর লিপি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘হেজাজি মায়েল কুফী’ লিপিতে এটি লেখা হয়েছে। মূল লেখায় নোকতা-জের-জবর-পেশ ছিল না। পরে এতে সংযোজন করার আভাষ পাওয়া যায়। বিরামচিহ্ন হিসাবে গোলায়িত তিনটি নোকতা ত্রিকোণাকার আকারে দেয়া হয়েছে। গ্রন্থটির প্রতিটি পৃষ্ঠা আলাদা করে লিখে জুঝ বাধাই করে গ্রন্থবদ্ধ করা হয়েছে। এতে কোন পৃষ্ঠা নম্বর নেই। বর্তমানে কলমকে ৪৫ডিগ্রি কোনে কেটে লেখা হয় কিন্তু এই লিপির কলম ১৮০ ডিগ্রি কোনে কাটা হয়েছে এবং চাল পুড়িয়ে চিনি, নিশাত ও আরবি গাম(আঠা) মিশিয়ে হাতে তৈরি কালিতে এটি লেখা হয়েছে।তবে শব্দের মধ্যে কোথাও কোথাও যের-জবর বুঝানোর জন্য লাল কালির ফোটা হরফের উপর-নিচ খুব কাছে ব্যবহার করা হয়েছে।কোথাও একই কালিতে হরফের নোকতা খুবই ছোট ও প্রায় অষ্পষ্টাকারে দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, কুরআনের লিপি হিসেবে প্রথমদিকে কুফি লিপির স্থানীয় নাম যেমন-হেজাজি, মক্কী, মাদানী ব্যবহৃত হত, তেমনি এর লেখন বৈশিষ্ট্য হিসেবে জযম, মাশ্ক, মায়েল(আইটালিক) নামকরণ করা হত। এই কুফি লিপিতে প্রায় ৩শ বছর কুরআন অনুলিপি করা হয়। পরবর্তী ৩শ বছর মুহাক্কাক লিপিতে কুরআনের অনুলিপি করা হয়। এরপর রায়হানী লিপি তেমন ব্যবহার হয়নি, রায়হানি লিপির কয়েকটি কুরআনের কপির কথা জানা যায়।তারপর তুরস্কের ক্যালিগ্রাফারগণ নাসখি লিপি কুরআন অনুলিপিতে ব্যবহার শুরু করেন এবং এটি এখন পর্যন্ত কুরআনের লিপি হিসেবে টিকে আছে।
ইরানে ইসলামের বিজয়ের পর ইরানের ক্যালিগ্রাফারগণ প্রথমদিকে কুফি লিপিতে কুরআন অনুলিপি করেন। ক্রমশ এটি এত উন্নতি লাভ করে যে, কারামাতিয়ান কুফির নাম জগদ্বিখ্যাত হয়ে যায়। তারপর নাশখ এবং তালিক লিপির সমন্বয় করে ‘নাশতালিক’ লিপি নামে একটি লিপি আবিস্কার হয়। ইরানের ক্যালিগ্রাফারগণ নাশতালিক লিপিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কুরআন অনুলিপিতে এর ব্যবহার অব্যাহত রাখেন। তবে ইরানের বাইরে এই লিপির কুরআন তেমন একটা নজরে পড়ে না।
পশ্চিম আফ্রিকায় কুফি লিপি স্থানীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে মাগরেবি লিপি, আন্দালুসিয়ান কুফি, কাইরোয়ান কুফি ইত্যাদি স্থাননামে এবং মাবসুত, মাগরেবি সুলুস, মাগরেবি নাসখী নামে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লিপিতে কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়।
চীন-জাপানে চিনি লিপি নামে নাশখী লিপির পরিবর্তিতরূপে কুরআন অনুলিপি করা হয়।
ভারত উপমহাদেশে তুর্ক-আফগানদের পৃষ্ঠপোষকতায় কুফি, নাসখি লিপির কুরআন প্রথম পর্যায়ে করা হত। পরে বিহারের ক্যালিগ্রাফার এবং সমুদ্রপথে আগত মিশর-সানআ, হেজাজের ক্যালিগ্রাফারগণ বাংলাদেশে বিহারি লিপি(নাশখি ও কুফি লিপির সমন্বয়) দিয়ে কুরআন অনুলিপি করেন। এটা সুলতানি আমলের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে গজনি ও কাশ্মিরের একদল ক্যালিগ্রাফার বাঙলার সালতানাত শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং নাশখি লিপির চমৎকার নজরকাড়া কুরআন অনুলিপি করেন। লৌখনুতে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লৌখনু নাসখি নামে একটি লিপিতে কুরআন অনুলিপি করা শুরু হয়। পরবর্তিতে এটি ‘হিন্দি নাশখী’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
লৌখনু ছাপা কুরআন, কুরআন কমপ্লেক্স, মদিনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব, ১৪২৮ হিজরি

১৮০০ সালের পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইংরেজদের মাধ্যমে কুফি লিপির পরিবর্তিত নিম্নমানের একটি ফন্টসেট তৈরি করা হয় এবং এই টাইপসেট দিয়ে হাত কম্পোজে কুরআন ছাপা শুরু হয়। এটি আজও অব্যাহত আছে। এই লিপির কুরআনকে ‘কলিকাতা ছাপা’ কুরআন বলে।
কলকাতা ছাপা কুরআন

 এতে বাঙলার অধিকাংশ মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে এতে হাতে লেখা কুরআনের ক্যালিগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য ও নান্দনিক ভাব পাওয়া যায় না। তাছাড়া হাতেলেখা কুরআনের যে আধ্যাত্মিক আবেদন রয়েছে, তা থেকে বাঙলার জনগণ বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে কুরআন হিফজ করার জন্য মাদ্রাসাগুলোতে লৌখনু ক্যালিগ্রাফিক লিপির কুরআন ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কুরআন হিফজের জন্য কলিকাতা ছাপা কুরআনের ব্যবহারের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না।
কুরআনে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকার লিপি স্থান ও সময়কালের চিহ্ন বহন করে।ক্যালিগ্রাফিতে দক্ষ ব্যক্তিগণ সহজে এর পর্যালোচনা ও সঠিক বিষয় তুলে আনতে পারেন। শুধু আরবি জানলেই এটা করা যায় না। আর আরবিতে অনভিজ্ঞরা এতে ভুল করা স্বাভাবিক।আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে কুরআনের আরবি ক্যালিগ্রাফির বিষয়ে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং এবিষয়ে দক্ষ লোক তৈরি হচ্ছে। এবিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরো এগিয়ে আসতে হবে এবং এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্য সুত্র :

১. THE RISE OF THE NORTH ARABIC SCRIPT AND ITS KURANIC DEVELOPMENT, WITH A FULL  DESCRIPTION OF THE KURAN MANUSCRIPTS IN THE ORIENTAL INSTITUTE.
THE UNIVERSITY OF CHICAGO PRESS, CHICAGO, ILLINOIS. JUNE 1939
২. Hat Sanatindan (calligraphy) ismek husn-i-Hat Hocalari Karma Sergisi  2013 Turkey
৩. CALLIGRAPHIC ART IN SULTANATE ARCHITECTURE  Shah Muhammad Shafiqullah ASIATIC SOCIETY OF BANGLADESH First Published: February 2012
৪. ISLAMIC CALLIGRAPHY, ANNEMAIE SCHIMMEL
৫. কাওয়ায়িদুল খত অল কিতাবাহ ওয়া তাত্ববিকাতিহা, ড. খালেদ মাহমুদ মুহাম্মদ ইরফান, দারুল নাশরি দুআলি, সৌদি আরব,২০০৮
৬.আল খত আল আরাবি মিন খিলাল আল মাখতুতাত, এরাবিক ক্যালিগ্রাফি ইন ম্যানাসক্রিপ্ট, রিয়াদ, সৌদি আরব ১৯৮৬
৭. ইন্টারনেট

Sunday, January 4, 2015

বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির পদযাত্রায় শিলালিপির ভূমিকা

 

Muhaqqaq style

-মোহাম্মদ আবদুর রহীম

ক্যালিগ্রাফিকে শুধুমাত্র 'হাতের লেখা' বলে পরিচয় দিলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় এর অর্থ। 'সুন্দর হাতের লেখা' বললে আক্ষরিক অর্থ বলা হয়। আরব সিভিলাইজেশন প্রবন্ধে বলা হয়েছে- আরবি লিপিকলা প্রবহমান নকশা এবং জটিল জ্যামিতিক ডিজাইনের সমন্বয়। এই নান্দনিক লিপিকলা সম্পর্কে আলেকজান্দ্রিয়ার দার্শনিক ও গণিতের জনক ইউক্লিদ বলেন, "একটি 'আধ্যাত্মিক কৌশল' হিসেবে ক্যালিগ্রাফিকে গত ১৩শত বছর ধরে আরবদের কলম শুধু বিশুদ্ধ এবং সমৃদ্ধ করেছে।" আসলে ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে লিপিকলা বা লিপি দিয়ে যে শিল্পকর্ম করা হয়।
Muhaqqaq style

বাংলা ভূখন্ডে প্রাচীন কাল থেকে যারা শাসন করেছেন, তারা সুবিধামত একটি ভাষাকে রাজভাষা করেছেন এবং নথিপত্রে তা ব্যবহার করেছেন, জনসাধারণের সাথে সংযোগের ক্ষেত্রে এভাষায় জনহীতকর কাজের পরিচিতি ফলক বানিয়েছেন। প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে পাথরে, তাম্র ফলকে এর নিদর্শন দেখা যায়। কাগজ বা টেকসইবিহীন মাধ্যমে এই নিদর্শন পাওয়া দুষ্কর। একটা মজার বিষয় হচ্ছে, ক্যালিগ্রাফির সত্যিকার পদযাত্রা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাচীন নিদর্শন খুজতে গিয়ে ১২০৬ সালে (১১২৭ শক) সংস্কৃত হরফে একটি উৎকীর্ণলিপির নমুনা পাওয়া গেছে কামরূপ অঞ্চলে। আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর তীরে প্রাপ্ত এই শিলালিপিটিতে একটি চমকপ্রদ তথ্য আছে, "১১২৭ শক, মধুমাসের(সম্ভবত চৈত্রমাস) ১৩তম দিবসে কামরূপ তুর্কীদের আক্রমণে পদানত হয়।" কিন্তু এই উৎকীর্ণ লিপিটিতে তথ্য থাকলেও এর প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য একেবারে আটপৌরে, এতে কোন শিল্পের ছোঁয়া নেই। অথচ তার বহুকাল পূর্ব থেকে বাঙ্গালায় পাথর খোদাই কাজ, বিশেষ করে উৎকীর্ণ মূর্তি শিল্পমানের শীর্ষে অবস্থান করছিল। আসলে নারীচিত্র অঙ্কন বা খোদাই, যা শিল্পকলার জৈবিকরস সিঞ্চন করলেও, ক্যালিগ্রাফির হরফে তা ফুটিয়ে তোলার বিষয়টি সেখানে দেখা যায় না। অন্যদিকে, বাঙ্গালায় মুসলিম শাসকদের সময় থেকে খোদাই কর্মে ক্যালিগ্রাফির নান্দনিক বা সৌন্দর্য প্রয়োগ সাধারণ বিষয় হয়ে দাড়ায় এবং সেটা আরবি-ফারসি লিপির মাধ্যমে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একপিঠে মূর্তি উৎকীর্ণ এবং অন্যপিঠে চমৎকার আরবি ক্যালিগ্রাফি উৎকীর্ণ করা হয়েছে। মুসলিম শাসনের আগে স্থাপত্য অলঙ্করণে উৎকীর্ণ মুর্তি বা টেরাকোটায় মুর্তির আধিক্য রয়েছে এবং ফুল-লতা-পাতার ব্যবহার গৌন থেকেছে।
Muhaqqaq style

 অন্যদিকে মুসলিম শাসন শুরুর পর এমন কোন উল্লেখযোগ্য ইমারাত পাওয়া যাবে না যেখানে ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার অনুপষ্থিত। সুতরাং বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির প্রচলন করেন মুসলিম শাসকরা। এই পদযাত্রায় মুসলিম তুর্ক-আফগান শাসকদের অবদান অসামান্য। ১২০৫ সালে তুর্কী বংশোদ্ভুত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাঙালা বিজয়ের মাধ্যমে শিলালিপিতে আরবি-ফারসি ক্যালিগ্রাফির যাত্রা শুরু হয়। সুলতানী ও মোঘল আমলের (১২০৫-১৭০৭ ইসায়ি) অসংখ্য শিলালিপির মধ্যে প্রায় চারশত নিদর্শন পাওয়া গেছে। সুলতানী আমলের(১২০৫-১৫৬৫ ইসায়ি) অধিকাংশ শিলালিপি আরবিতে এবং মোঘল আমলের(১৫৬৫-১৭০৭ ইসায়ি) অধিকাংশ শিলালিপি ফারসিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এসব শিলালিপি মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা, মাজার, কবরগাহ, পুল, প্রশাসনিক ইমারাত ইত্যাদিতে স্থাপন করা হয়েছে। অধিকাংশ ফলকে কুরআন-হাদীসের বাণী, সমকালীন বিষয়, স্থাপণের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সে সময়ের ধর্মীয়-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বিশেষকরে ক্যালিগ্রাফির উন্নয়ন, গতি-প্রকৃতি এবং এর শৈল্পিক প্রয়োগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সুলতানী আমলের শিলালিপির বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে তুরস্কের সমকালীন ক্যালিগ্রাফির প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাথর কিংবা পোড়ামাটিতে উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এবং সমসাময়িক তথ্য উন্মোচনে ফলপ্রসু মাধ্যম। বাঙ্গালায় রাজনৈতিকভাবে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয় ১২০৫ ইসায়িতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খালজির হাতে। এ সময় দিল্লীর সম্রাট ছিলেন কুতব উদ্দিন আইবেক। কিন্তু তারও বহু আগে বাঙ্গালায় মুসলিম জনসমাজ ছিল। রাজা লক্ষণ সেনের দরবারে শেখ জালাল উদ্দিন তাবরেজী নামে একজন মুসলিম বিদ্বান ব্যক্তি সভাসদ ছিলেন। লক্ষণ সেনের আরেক সভা-পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র রচিত 'শেখ শুভোদয়া'য় আমরা শেখ জালাল উদ্দিনের বর্ণনা দেখতে পাই। রাজসভায় একজন মুসলমান পণ্ডিত থাকার অর্থ হল রাজ্যে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠির বিদ্যমান থাকার প্রমাণ।
Muhaqqaq style

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত বাঙ্গালার উৎকীর্ণ লিপির সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটি হচ্ছে লালমনিরহাটের হারানো মসজিদ ইস্টকলিপি। পোড়ামাটির তৈরি ইটে উৎকীর্ণ করে কালেমা তৈয়্যবা এবং ৬৯ হিজরি লেখা হয়েছে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রাম। এখানেই আবিষ্কৃত ৬৯ হিজরিতে নির্মিত মসজিদটির সামনে ফসলের মাঠটি একদা ছিল চকচকার বিল। এলাকার প্রবীণ মানুষের কাছে স্থানটি আজও সাগরের ছড়া নামে পরিচিত, যার অনতিদূরে তিস্তা নদীর অবস্থান। ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি। সুতরাং এই অববাহিকায় ৬৯ হিজরি বা ৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের ঘটনা বিস্ময় জাগানিয়া হলেও সেটা অস্বাভাবিক নয়। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল বলেন, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে যে প্রাচীন সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে প্রাচীন রোমান ও আরব-সভ্যতার সম্পর্ক ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সভ্যতার সঙ্গে সভ্যতার এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই আরব বণিকেরা লালমনিরহাটের ওই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করেন টিম স্টিল।
গবেষকরা ঐ ইস্টকলিপিতে তারিখের স্থলে একটি বিষয় এড়িয়ে গেছেন। "সানাত ১, ৬৯" অর্থাৎ বছরের ১ম মাস(মহররম), ৬৯ হিজরি। ৬৯১ ইসায়িতে মসজিদটি নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও ইস্টকলিপির সঠিক বয়স নির্ধারণে রাসায়নিক পরীক্ষার কথা জানা যায়নি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য, এর লিপি বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের প্রথম শতকে যে লিপিসমূহ ছিল, বিশেষ করে ইরাক থেকে বাঙালার দিকে যে লিপি বিস্তৃতি লাভ করেছিল, তাকে 'খত আল বাহরি' বলা হয়। পরবর্তিতে একে 'বিহারী লিপি' বলে ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নামকরণের দুটো কারণ আমরা খুজে পাই। এক. সমূদ্রপথে এ লিপির খোদাই কারিগর ও লিপিকর বাঙ্গালায় এসেছিলেন এবং সমূদ্রের ঢেউয়ের মত এলিপির গতিপ্রকৃতি ছিল। দুই. বাঙ্গালার পশ্চিম-উত্তর অংশে বিহার এলাকায় পাথরে খোদাই ও পুথিপত্র রচনায় একদল ক্যালিগ্রাফার এ লিপিটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এজন্য স্থান নামের সাথে এর নামকরণ হয়েছে।

বর্তমান সময়ের ইরাকের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফি গবেষক ইউসুফ জিন্নুনের মতে, সমুদ্র পথে এলিপির বাঙ্গালায় আগমণ এবং উন্নতি সাধনের কারণেই একে 'খত আল বাহরি' নাম দেয়া হয়। খত আল বাহরি অর্থ- সমুদ্র লিপি।
আরেকটি বিষয় এলিপিটির আলিফের নিচের অংশ বামে একটু বেশি ঝুলানো। এ ধরণের আলিফকে বলা হয় "আলিফ মুশা'য়ার"। উৎকীর্ণ লিপিতে আলিফ মুশা'য়ার প্রয়োগ করা ইসলামের প্রথম শতকের লিপির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল।
Muhaqqaq style

গবেষকগনের মতে, বাঙ্গালায় কালোপাথর (ব্লাক ব্যাসল্ট) বা বেলে পাথরে (স্যান্ড স্টোন) উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির নমুনা সমূহ সুলতানী আমল (১২০০ ইসায়ি) থেকে শুরু হয়েছে। বাঙ্গালায় ইমারাতে ব্যবহৃত ব্লাক ব্যাসল্ট এসেছে ততকালিন বিহার এবং বর্তমানে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজমহলের কালো আগ্নেয়শিলা পাহাড় থেকে। আহমদ হাসান দানী তার "মুসলিম আর্কিটেকচার ইন বেঙ্গাল" গ্রন্থে লিখেছেন, মালদা জেলার রাজমহল পাহাড় থেকে ব্লাক ব্যাসল্ট আনা হত এবং কদাচিৎ বিহার থেকে স্যান্ড স্টোন এবং গ্রানাইট আনা হত। এছাড়া কখনও খোরাসান থেকে ব্লাক ব্যাসল্ট আনা হত বলেও ইতিহাসে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন হল, ইস্টক লিপি উৎকীর্ণের বিষয়টির সাথে ব্লাক ব্যাসল্ট ও স্যান্ড স্টোনের সম্পর্ক কী? বাঙ্গালার মুসলিম শাসনের আগের কোন ব্লাক ব্যাসল্ট বা স্যান্ড স্টোনের ওপর আরবি ক্যালিগ্রাফির উৎকীর্ণ নমুনা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর থেকে প্রাচীন পোড়া মাটির ইট এবং তাতে উৎকীর্ণ লিপির নমুনা আছে।
বাঙ্গালায় তুর্ক-আফগান শাসক এবং তাদের সাথে আগত পাথরে উৎকীর্ণ লেখা ও নকশা খোদাইয়ের দক্ষ শিল্পীরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। এজন্য সুলতানী আমল ও মোগল আমলের ইমারাতে তাদের শিল্পকর্মের বিস্তৃত নমুনা দেখা যায়।
রাজশাহীর সুলতানগঞ্জে প্রাচীন একটি সেতুতে বাঙ্গালার দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন ওয়াদ্দুনিয়া (আলি মর্দান খালজী, ১২১০-১২১৩ ইসায়ি) সময়ের ব্লাক ব্যাসল্টে উৎকীর্ণ ফার্সি ভাষায় ক্যালিগ্রাফি ফলক পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি বরেন্দ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত। এর লিপি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক বলেন, এটা তাওকি লিপি। এ প্রবন্ধ লেখকের মতে, এর খাড়া রেখা ও আনুভূমিক রেখার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে একে খত আল বাহরির স্থাপত্য সংস্করণ বললে অধিক যুক্তিযুক্ত হয়। প্রাচীন তাওকি লিপিতে শব্দের শেষ হরফের শেষাংশ বা লেজ পরবর্তী শব্দের প্রথম হরফের সাথে বিশেষ নিয়মে লেগে যায়। যেটা এ নমুনায় দেখা যায় না। অন্যদিকে আনুভূমিক রেখার শেষাংশ পুষ্ট হয়ে ঢেউয়ের মত ভাব দেখা যায় বাহরি লিপিতে। এ নমুনায় সেটা বেশ পাওয়া যায়। তিন লাইনের এ শিলালিপিতে  লাইন বিভক্তি রেখা আছে। এতে জমিন খোদাই এবং হরফ উচু রাখা হয়েছে।
কালো পাথরে পলিশ(পৃষ্ঠদেশ মসৃণ করার পদ্ধতি) করলে কালো চকচকে ভাব আসে। এর ওপর খোদাই করলে, খোদাই অংশ ছাই রঙের সাদাটে ভাব হয়। হরফ খোদাই করলে অল্প সময়ের মধ্যে একটি নামফলক তৈরি করা যায়। কিন্তু সুলতানী আমলের প্রায় সবগুলো এবং মোগল আমলের অধিকাংশ পাথরে জমিন খোদাই করা হয়েছে, ফলে হরফ এবং বিভক্তি রেখা জমিন থেকে উচু হয়েছে। এটা বলা যত সহজ, হাতে করা ততটাই কঠিন। এ বিষয়টি চিন্তা করলে দক্ষতার উচ্চমান অনুধাবন করা যায়। পাথর খোদাই কাজ দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমে একজন ক্যালিগ্রাফার পুরো লেখাটি(টেক্সট) পাথরে কালি বা সিসার কলম দিয়ে একে দেন, তারপর উস্তাদ খোদাইকার ছেনি (খোদাই করা লোহার ছোট বাটালি ধরণের যন্ত্র) দিয়ে হরফের আউট লাইন বের করে দেন, একে কাটাই বলে। দ্বিতীয় পর্যায়ে হরফের আউটলাইন ধরে জমিনকে ৫ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত খোদাই করে একজন সাগরেদ বা নবিশ খোদাইকার। একে চটানো বলে। খোদাই কাজে ওস্তাদ খোদাইকারের ওপরই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যের মান রক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। আর এটা দু'এক বছরে অর্জন করা সম্ভব নয়। বাঙ্গালার সুলতানী আমলের মাঝামাঝি সময় থেকে খোদাই দক্ষতা অসাধারণ পর্যায় পৌছেছিল। কিছু কিছু নমুনায় যিনি টেক্সট একেছেন তিনিই খোদাই করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
পশ্চিম বঙ্গের বিরভুমের সিয়ানে একটি খানকায় সুলতান গিয়াস উদ্দিন ইওদ খালজীর (১২২১ ইসায়ি) সময়ের একটি নামফলক পাওয়া গেছে। যেটার লিপিশৈলিতে তেমন পার্থক্য নেই সুলতানগঞ্জের শিলালিপি থেকে।
রাজশাহীর নওহাটায় একটি অজ্ঞাতনামা মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে বিদ্রোহী খালজী সেনা নায়ক বলাকা খানের (১২২৯-১২৩০ ইসায়ি) সময়ের একটি শিলালিপি উদ্ধার করা হয়। বরেন্দ্র জাদুঘরে বর্তমানে সেটি সংরক্ষিত। লিপির ভাষা ফারসি। লিপি শৈলি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট কোন মন্তব্য কেউ করেননি, তাওকি ও সুলুস লিপির মিশ্রন বলে অনেকে মত দিয়েছেন। এ প্রবন্ধ লেখকের মতে, পূর্বের শিলালিপি দুটি থেকে এর বিশেষ পার্থক্য হচ্ছে, উৎকীর্ণ বাহরি লিপির এটি একটি বলিষ্ঠ নমুনা। আলিফ মুশা'য়ার এবং আলিফ মুরাক্কাব বা আলিফ নেহাইয়্যাহ(হরফের সাথে মিলিত আলিফ)সহ ত্বয়া, কাফ, লামের আলিফের(খাড়া রেখা) মাথায় ডানদিকে নিশানাকৃতির জুলফ(আকশির মত তিনকোনা পতাকা) বিজয় অনুভব এবং আনুভূমিক হরফের শেষ প্রান্ত বাহরি লিপির পূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। এতেও জমিন খোদাই(রিভার্স খোদাই) করা হয়েছে। আয়তাকার প্যানেলের এধরণের কাজ তুর্কি ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ শিলালিপির ক্যালিগ্রাফার এবং খোদাইকার তুর্কি বংশোদ্ভুত বা ঐ ধারার কাজ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল বলে অনুমান করা যায়। এ শিলালিপির মিম মুরাক্কাব আউয়াল(মিলিত প্রথম মিম) মাথার শুরু এবং শেষ সংযুক্ত নয়। জিমের  মাথার(র'স) প্রথমাংশ বৃত্তাকার ও ভারি। কাফ মুরাক্কাবের আলিফের পেট বা বুক বরাবর ডানপাশে আল সুওবানি(অজগরাকৃতি রেখা) শিলালিপিটিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। এ তিনটি শিলালিপির আলোচনা থেকে খালজী শাসনামলের (১২০৩-১২৩০ ইসায়ি) ক্যালিগ্রাফির শৈলি বিষয়ক একটি চিত্র পাওয়া যায়। স্থাপত্যে বাহরি লিপির প্রয়োগ এবং এর দ্রুত উন্নয়নে ক্যালিগ্রাফার ও খোদাইকারের আন্তরিকতা এবং নিপুনতা অর্জনে একনিষ্ঠতা প্রশংসনীয়।
Bihari style

ইলিয়াসশাহী (১৩৪২-১৪৮৭ ইসায়ি) শিলালিপিতে খাটি আরবি শৈলিতে ফিরে যাওয়ার একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। সুলুস লিপির অসাধারণ প্রয়োগ হয়েছে এসময়।
হাদরাত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ ক্যালিগ্রাফি (১৩৭৪ ইসায়ি) সুলুস লিপির অন্যতম সেরা উদাহরণ। মিহরাবে, দেয়ালে ক্যালিগ্রাফির সাথে ফুলেল অলংকরণের ব্যবহার আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে একে। মিহরাবে উৎকীর্ণ সুলুস লিপিটির নান্দনিক রূপ-সৌন্দর্য সমসাময়িক তুর্কি সুলুস লিপির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। তবে মসজিদের অন্য দেয়ালে উৎকীর্ণ সুলুস লিপিতে বেশ পার্থক্য আছে। এতে ধারণা হয়, মসজিদটিতে একাধিক ক্যালিগ্রাফার কাজ করেছেন। মসজিদে মহিলা নামাজীদের প্রবেশদ্বারের উপরে কালিমা তৈয়্যবার সুলুস শৈলির কম্পোজিশনটি বাঙ্গালায় মধ্যযুগের উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির অন্যতম সেরা কাজ।
অন্যদিকে নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গাজীপীরের মাজার থেকে প্রাপ্ত শিলালিপিটি সুলুস শৈলি ভেঙ্গে তুগরায় রূপান্তর বলা যায়। খাড়া হরফের মাথাগুলো মোটা আর ভারি। বাশের বেড়ার মত হরফের খাড়া রেখার বুক ও পেট বরাবর কাফ হরফের সুওবান আর ফি, নুন দিয়ে বন্ধন সৃষ্টি। নিচে হরফের কম্পোজিশন দিওয়ানী লিপির তলোয়ার কম্পোজিশন সদৃশ করা হয়েছে। এটা তুর্কি ধারার বাঙ্গালা সংস্করণ বলা যায়। এধরণের কাজ থেকে বেংগল তুগরার স্বকীয় ধারা বিকশিত হয়। সুলতান আহমদ শাহ(১৪৩২-১৪৪১ ইসায়ি) সময়ের শিলালিপি এটি।

গৌড়ের চান্দ দরওয়াজা শিলালিপিটি বারবাক শাহের(১৪৬৬-১৪৬৭ ইসায়ি) সময়ের। তুগরার অসাধারণ একটি নমুনা এটি। খাড়া আয়তন বিশিষ্ট দুই সারি ঘরগুলোতে চমৎকার তুগরা করা হয়েছে। চারপাশে বর্ডারে সুলুস লিপি এবং শামসি (সূর্য) সদৃশ ফুল দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে। এটি সমসাময়িক ক্যালিগ্রাফির একটি সেরা কাজ।
সুলতানী আমলের শেষদিকে মাহমুদ শাহের (১৫৩৪-১৫৩৫ ইসায়ি) সময়ের একটি অজ্ঞাতনামা শিলালিপির ছবিতে দেখা যায় সুলুস লিপিকে চমৎকার করে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এসময় পোড়া মাটির ফলকে সুলুস লিপির কিছু কাজ হয়েছে। সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফি ছিল পরিপূর্ণ আরবি লিপি শৈলিতে প্রত্যাবর্তনের একটা প্রচেষ্টা। এসময়ে ভাষাগত বিষয়টি ফারসীর পাশাপাশি আরবির প্রতি বিশেষ টান পরিলক্ষিত হয়। সুলতানি আমলে প্রচুর মসজিদ ও মাদ্রাসা একসাথে গড়ে ওঠে এবং বিশুদ্ধ আরবি চর্চার দিকে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। সুলুস লিপি হচ্ছে আরবি লিপিশৈলির মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং নান্দনিক শৈলি। বাঙ্গালার স্বাধীন সুলতানগণ যথার্থই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যবোধের সমঝদার ছিলেন এবং সেরা শৈলিটিরই প্রসার ও উন্নয়নে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।
সুলুস শৈলির আধুনিক সংস্করণ মুহাক্কাক লিপি। এটি মূলত: "খত আল-মাসাহিফ" বা কুরআনের লিপি হিসেবে বহুল পরিচিত। কুরআন লিপিবদ্ধ করণে চামড়ার অধিক ব্যবহারের জন্য কুরআনকে মুসহাফও বলা হয়। ইসায়ি ৯ম শতকের প্রথমদিকে আব্বাসীয় খলিফা মামুনের সময়ে লিপিটির উন্নয়ন ও প্রসার হয়। এটি ক্যালিগ্রাফির জনক ইবনে মুকলার(মৃ. ৯৪০ ইসায়ি)হাতে পরিশীলিত এবং ইবনে বাওয়াব(মৃ. ১০২২ ইসায়ি) ও ইয়াকুত আল মুস্তাসিমীর(মৃ. ১২৯৮ ইসায়ি)হাতে শৈলিতে শীর্ষ মানে পৌছায়। বাঙ্গালায় সুলতানী আমলে উৎকীর্ণ লিপি হিসেবে মুহাক্কাক লিপির ব্যবহার ক্যালিগ্রাফির উৎকর্ষতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বরেন্দ্র মিউজিয়ামে রক্ষিত(নং-৩২৪) ত্রিকোণাকার একটি কালো পাথরের ওপর উৎকীর্ণ এ লিপিটি মুহাক্কাক শৈলির একটি উৎকৃষ্ট নমুনা। গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক একে সুলুস লিপি বলেছেন। সম্ভবত সাধারণ দৃষ্টিতে সুলুস এবং মুহাক্কাক একই রকম দৃশ্যমান হওয়ায় এ বিভ্রাট হয়েছে। সুলুস লিপিতে লফজে জালালাহ'র "হা" এবং মুহাক্কাক লিপিতে লফজে জালালাহ'র "হা" সাধারণত ভিন্ন হয়ে থাকে। মুহাক্কাক লিপি সুলুস লিপি থেকে অপেক্ষাকৃত সরল, স্পষ্ট এবং এতে তাজবিদ ও তাশকিল প্রয়োজন মাফিক প্রয়োগ করা হয়। সতর বা বেজ লাইনের নিচে হরফের অংশ প্রায় ২০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি কোণে ছয় নোকতার বেশী প্রলম্বিত হয়। অন্যদিকে সুলুস লিপিতে এটি ৪৫ ডিগ্রি কোণে ছয় নোকতা বরাবর হয়। ইয়া মাজহুল বা কাফ সুওবান সুলুস লিপি থেকে আলাদা। সতরের উপরে হরফের খাড়া দন্ড সুলুস লিপি থেকে একটু লম্বা এবং কিছুটা চিকন হয় এবং লম্ব দন্ডের নিচের অংশ বেশ খানিকটা চিকন হয় এবং মুরাক্কাব হলে নিচের অংশ প্রায় দুই নোকতা বরাবর চেরা হয়।। মুহাক্কাক এবং রায়হানী লিপি পার্থক্য করা আরো কঠিন। একই কলমে রায়হানী লিপি মুহাক্কাক থেকে সাইজে কিছুটা ছোট এবং আরো স্পষ্ট হয়। বিশেষ করে মুহাক্কাক লিপিতে বিসমিল্লাহর একটি বিখ্যাত ফর্ম আছে। প্রায় তিনশ বছর এলিপিটি কুরআনের লিপি হিসেবে ব্যবহারের সময় বিসমিল্লাহ'র এ ফর্মটির অধিক ব্যবহার দেখা যায়। বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত শিলালিপিটির বিসমিল্লাহটি সেই ফর্মে উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
গবেষক অধ্যাপক ইউসুফ সিদ্দিক রচিত "হিস্টোরিকাল এন্ড কালচারাল এস্পেক্ট অব দ্যা ইসলামিক ইনসক্রিপশনস অব বেঙ্গল: আ রিফ্লেক্টিভ স্টাডি অব সাম এপিগ্রাফিক ডিসকোভারিস" গ্রন্থের ২৪,২৯,৩১,৩৩ নং ইনসক্রিপশনকে সুলুস বলে তিনি উল্লেখ করলেও মূলত সেগুলো মুহাক্কাক লিপি।
ড. আবদুল করিম তার "করপাস অব দ্যা এরাবিক এন্ড পারসিয়ান ইনসক্রিপশনস অব বেঙ্গল" গ্রন্থে প্লেট-২৯-এ, ৩৬, ৪২-এ, ৪৩-এ'র লিপি নাশখ বলে উল্লেখ করেছেন। আসলে এগুলোও মুহাক্কাক লিপির উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
মোগল শাসকরা (১৫৭৬-১৭৫৭ ইসায়ী) শিয়া প্রভাবিত ছিলেন। ফারসি ভাষার মত ফার্সি লিপি নাস্তালিক লিপির প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল প্রায় প্রশ্নাতীত। এজন্য সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফার ও খোদাইকারদের একটি বৃহদাংশ বিপাকে পড়েন। এসময় বাঙ্গালার উৎকীর্ণ লিপিতে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা দেখা যায়। সামান্য সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া আরবি মিশ্রিত ফারসি শিলালিপিতে সৌন্দর্য বলতে তেমন কিছু ছিল না। তবে কিছুকালের মধ্যে ইরান থেকে লিপি শিল্পী ও খোদাইকারদের বাঙালায় আগমন ঘটে এবং নাস্তালিক লিপি দিয়ে চমৎকার সব নামফলক তৈরি হতে থাকে। নামফলকে কুরআন-হাদিসের বাণী বাদ দিয়ে ফার্সি কবিতার ছত্র জায়গা করে নেয়। মাজারগুলো পুজার আখড়ায় পরিণত হয়। নানা নামে-বেনামে অসংখ্য পীর-আওলিয়ার মাজারের উদ্ভব ও ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগলরা বাঙ্গালায় শাসন ক্ষমতা দখল করে ইসলামী আকিদা ও তমুদ্দুনের তরীটি ডুবিয়ে দেয়। আরবি ক্যালিগ্রাফির জৌলুস নিভিয়ে ফার্সি ক্যালিগ্রাফির নিশান উড়ায়।
ফার্সি ক্যালিগ্রাফারদের 'শিরিন দাস্ত' 'জরীন দাস্ত' উপাধী আর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। এসময় গুলজারের মত কিছু ফার্সি লিপি বাঙ্গালায় ছড়িয়ে পড়ে। কুরআন লেখায়ও এর বেশ প্রভাব পড়ে। ইরানী নাশখ লিপিতে অনেক কুরআনের কপি করা হয়। মোগল আমলের নামকরা কিছু ক্যালিগ্রাফারের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া গেলেও সুলতানী আমলের ক্যালিগ্রাফারদের প্রায় সবাই ইতিহাস থেকে নিচিহ্ন হয়ে গেছেন। অথচ একটু গভীর দৃষ্টিতে দেখলে ধারণা করা যায়, সুলতানী আমলের বাঙ্গালার আরবি ক্যালিগ্রাফি স্বকীয়তা, বিশুদ্ধতা ও শৈলির দিক দিয়ে বিশ্ব মানের ছিল। একই সময়ে(১২০০-১৬০০ ইসায়ি) তুরস্কের পাথরে উৎকীর্ণ সুলুস, নাশখ, মুহাক্কাক, রায়হানী লিপির হুবহু মিল বাঙ্গালার ক্যালিগ্রাফিতে বিদ্যমান। এমনকি বিরাম চিহ্ন, শামসী ও পৃথক বর্ডার লাইন দিয়ে খোপ খোপ করার পদ্ধতি ও খোদাই(জমিন খোদাই) নীতিমালা হুবহু তুরস্কের ক্যালিগ্রাফির  অনুসরন করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খোদাই মান ও লিপির শৈল্পিক প্রয়োগ উৎকৃষ্ট ও নিখুত হয়েছে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খোদাই কাজে সেই মান অনুপস্থিত। এছাড়া ধারণা করা যায়, এসব লিপির পাঠক ও শিল্পমান সমঝদার সেসময়ে কম ছিল না।
ক্যালিগ্রাফির আধ্যাত্মিক আবেদন এতটাই প্রবল হয়েছিল যে, মূর্তিখোদাই পাথরের উল্টা পাশ মসৃন করে তাতে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত ঢাকার মান্দ্রা(মান্ডা) মসজিদ (খোদাই কাল-১৪৩৩ ইসায়ি) উৎকীর্ণ লিপির ফলকের উল্টাপাশে বিষ্ণু বা তারা মূর্তি খোদাই করা আছে। এলিপিটিকে ড. আবদুল করিম প্রচলিত নাশখ উল্লেখ করেছেন, অথচ এটি বিহারী লিপির চমৎকার নিদর্শন। এ ফলকটির চার লাইন লেখার মধ্যে শেষ এক লাইন ও ৩য় লাইনের শেষের অংশ বিশেষ খোদাই সম্পন্ন হয়নি, তবে হরফের আউট লাইন খোদাই করা হয়েছে। এ শিলালিপি থেকে পাথর খোদাইয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বর্তমানে পুরাণ ঢাকার শাখারী পট্টি ও বায়তুল মোকারম এলাকায় পাথর খোদাই এচিং পদ্ধতিতে রুপান্তর ঘটেছে। অথচ এক দশক আগেও হাতে পেনসিল ডিজাইন ও হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে হাত খোদাই চালু ছিল। তবে মোঘল আমলের শেষ দিকে এসে রিভার্স বা জমিন খোদাই উঠে যায়, সেখানে হরফ খোদাই চালু হয় আর ইংরেজ শাসন আমলে ইংরেজি হরফ খোদাই তাদের ঐতিহ্য বিধায় গত এক দশক পর্যন্ত হাতে হরফ খোদাই চালু ছিল। বর্তমানে এচিং পদ্ধতিতেও হরফ খোদাই চালু আছে। তবে ইসলামী ঐতিহ্য হচ্ছে জমিন খোদাই করে হরফকে উচু করা। এটি যেমন কঠিন, তেমনি নান্দনিক ও দক্ষতার পরিচায়ক।
বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির পদযাত্রায় শিলালিপির ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের শিকড় সন্ধানে এ বিষয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন এবং এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবি জানাই।
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
লেখক- এমফিল গবেষক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।